রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনন্য রহমত ও বরকতের সওগাত নিয়ে আসে, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগে পূর্ণ। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তি থেকে বিরত থাকার এই কঠোর সাধনার নামই সিয়াম বা রোজা। প্রতিটি ইবাদতের মতো রোজারও কিছু পূর্বশর্ত ও নিয়ম রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো নিয়ত বা সংকল্প। সাহরি খাওয়ার মাধ্যমে আমরা রোজার প্রস্তুতি গ্রহণ করি, কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে একটি বহুল প্রচলিত প্রশ্ন প্রায়ই উঁকি দেয়—রোজা রাখার জন্য কি কোনো নির্দিষ্ট আরবি দুআ পাঠ করা আবশ্যক? যদি কেউ সেই দুআটি না জানে বা না পড়ে, তবে কি তার রোজা হবে না? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর না জানার কারণে অনেকেই দ্বিধাগ্রস্ত হন এবং ইবাদতের মূল নির্যাস থেকে দূরে সরে যান। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতিটি আমলের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে নিয়তের ওপর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল।" (সহীহ বুখারী, হাদীস ১)। অর্থাৎ, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কৃত সংকল্পই হলো ইবাদতের প্রাণ। তাই রোজা রাখার ক্ষেত্রেও নিয়তের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেই নিয়ত প্রকাশের পদ্ধতি নিয়ে সমাজে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যা নিরসন করা প্রয়োজন।
শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গিতে রোজা রাখার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো শব্দ বা বাক্য মুখে উচ্চারণ করে বলা কুরআন বা সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত নয়। নিয়ত শব্দটি আরবি, যার অর্থ হলো সংকল্প বা ইচ্ছা করা। ফিকাহবিদগণের সর্বসম্মত রায় হলো, নিয়ত সম্পূর্ণ অন্তরের বিষয়, জিহ্বার কাজ নয়। যখন একজন মুসলিম ভোররাতে বা শেষ রাতে ঘুম থেকে ওঠেন এবং সাহরি গ্রহণ করেন এই উদ্দেশ্যে যে তিনি আগামীকালের রোজা রাখবেন, তখনই তার নিয়ত সম্পন্ন হয়ে যায়। এর জন্য আলাদা করে কোনো আরবি বাক্য বা মন্ত্রের মতো শব্দাবলী উচ্চারণ করার প্রয়োজন নেই। সাহরি খাওয়াটাই মূলত রোজার নিয়তের বহিঃপ্রকাশ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাহরি খাওয়ার প্রতি উৎসাহিত করে বলেছেন, "সাহরি খাও, কারণ সাহরিতে বরকত রয়েছে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯২৩)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সাহরি গ্রহণ করা একটি সুন্নাহ এবং এটি রোজা রাখার প্রস্তুতিরই অংশ। সুতরাং, মনে মনে দৃঢ় ইচ্ছা থাকাই যথেষ্ট যে আমি আল্লাহকে খুশি করার জন্য আজ রোজা রাখছি।
তবে আমাদের সমাজে এবং বিভিন্ন ক্যালেন্ডারে রোজা রাখার একটি নির্দিষ্ট আরবি দুআ বা নিয়তের বাক্য ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে। বাক্যটি হলো: "নাওয়াইতু আন আসুমা গাদাম মিন শাহরি রামাদ্বানাল মুবারাকি ফারদ্বান লাকা ইয়া আল্লাহু ফাতাক্বাব্বাল মিন্নি ইন্নাকা আনতাস সামিউল আলীম।" যার অর্থ: "হে আল্লাহ! আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্য রমজান মাসের এই পবিত্র রোজা রাখার নিয়ত করছি। অতএব, তুমি আমার পক্ষ থেকে তা কবুল করো। নিশ্চয়ই তুমি সবকিছু শোন এবং সবকিছু জানো।" এই দুআটি নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ না থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট যে, এটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বা সাহাবায়ে কেরাম থেকে বর্ণিত কোনো হাদীস নয়। এটি মূলত পরবর্তী যুগের ফিকহবিদগণ সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য তৈরি করেছিলেন যাতে তাদের অন্তরের সংকল্পটি ভাষায় প্রকাশ করতে সহজ হয়। যদি কেউ মনে করেন যে এই আরবি বাক্যটি পাঠ না করলে রোজা হবে না, তবে সেটি ভুল ধারণা এবং বিদআতের পর্যায়ে পড়তে পারে। কিন্তু কেউ যদি মনে করেন যে অন্তরের সংকল্পের পাশাপাশি মুখে উচ্চারণ করলে তার মনোযোগ বা একাগ্রতা বাড়ে, তবে তা পড়া হারাম নয়। তবে সর্বোত্তম এবং সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি হলো অন্তরের সংকল্প বা দৃঢ় ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেওয়া।
রোজার নিয়তের ক্ষেত্রে যেমন অন্তরের সংকল্পই যথেষ্ট, ঠিক তেমনি ইফতারের সময় নির্দিষ্ট দুআ পাঠ করা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। ইফতারের মুহূর্তটি দোয়া কবুলের সময়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইফতারের সময় যে দুআটি পড়তেন তা হলো: "যাহাবায যামাউ, ওয়াবতাল্লাতিল উরূকু, ওয়া ছাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ।" অর্থ: "পিপাসা দূর হয়েছে, শিরা-উপশিরা সতেজ হয়েছে এবং প্রতিদান সুনিশ্চিত হয়েছে, ইনশাআল্লাহ।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৩৫৮)। এই দুআটি সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এবং এটি পাঠ করা উত্তম। এখান থেকে বোঝা যায় যে, ইসলামে যেখানে নির্দিষ্ট দুআ আছে সেখানে তা অনুসরণ করা উচিত, আর যেখানে নির্দিষ্ট কোনো শব্দমালার বাধ্যবাধকতা নেই, সেখানে অন্তরের অবস্থাই মুখ্য।
রোজা রাখার মূল উদ্দেশ্য কেবল উপবাস থাকা বা নির্দিষ্ট কিছু আরবি শব্দ আওড়ানো নয়, বরং এর উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করা। পানাহার থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি মিথ্যা, গীবত, অশ্লীলতা এবং সকল প্রকার পাপ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখাই হলো প্রকৃত রোজাদারের বৈশিষ্ট্য। তাই রোজার নিয়ত নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করে বা কোনো নির্দিষ্ট বাক্য মুখস্থ করার ওপর জোর না দিয়ে, আমাদের উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়া। সাহরি খাওয়ার সময় আল্লাহর হুকুম পালনের যে স্পৃহা অন্তরে জাগ্রত হয়, সেটাই প্রকৃত নিয়ত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের বাহ্যিক লৌকিকতার চেয়ে অন্তরের ইখলাস বা একনিষ্ঠতাকে বেশি মূল্য দেন। সুতরাং, আসুন আমরা বিশুদ্ধ নিয়তে, সুন্নাহসম্মত উপায়ে সাহরি ও ইফতার গ্রহণের মাধ্যমে রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভে সচেষ্ট হই। আল্লাহ আমাদের সকলের সিয়াম কবুল করুন।

আপনার মতামত লিখুন :