বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬ ফাল্গুন ১৪৩২

রমজানের বরকত লাভে সেহেরি ও ইফতারের গুরুত্ব: হাদিসের আলোকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬, ১২:২৮ পিএম
রমজানের বরকত লাভে সেহেরি ও ইফতারের গুরুত্ব: হাদিসের আলোকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ

রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আমাদের মাঝে প্রতি বছর ফিরে আসে পবিত্র মাহে রমজান। এই মাসে মুসলিমরা সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তি থেকে বিরত থাকেন। সিয়াম সাধনার এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় দুটি বিশেষ মুহূর্ত বা খাবারের আয়োজন রোজাদারের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়, যা হলো সেহেরি এবং ইফতার। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, এগুলো কেবল শারীরিক ক্ষুধা ও তৃষ্ণা নিবারণের মাধ্যম বা উপবাসের শুরু ও শেষের আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। কিন্তু ইসলামের গভীর দর্শনে এই দুটি খাবারের পেছনে রয়েছে এক বিশাল আধ্যাত্মিক ও সামাজিক তাৎপর্য। 

সেহেরি ও ইফতার কেবল দেহকে টিকিয়ে রাখার রসদ নয়, বরং এগুলো ইবাদতেরই অংশ, যা পালন করার মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর নির্দেশ এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সুন্নাহর অনুসরণ করেন। অনেকেই হয়তো জানেন না যে, এই দুটি খাবার সঠিকভাবে গ্রহণ না করলে বা অবহেলা করলে আমরা রমজানের কাঙ্ক্ষিত সওয়াব ও বরকত থেকে বঞ্চিত হতে পারি। তাই এই নিবন্ধে আমরা ইসলামের সুমহান শিক্ষার আলোকে গভীরভাবে জানার চেষ্টা করব সেহেরি ও ইফতারের প্রকৃত হাকিকত, এদের ইসলামিক গুরুত্ব এবং সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি সম্পর্কে।

দিনের রোজা শুরুর প্রস্তুতি হিসেবে ভোররাতে সুবহে সাদিকের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে রোজাদাররা যে খাবার গ্রহণ করেন, তাকে সেহেরি বলা হয়। ফজর নামাজের আজানের আগ পর্যন্ত সেহেরি খাওয়ার সময় নির্ধারিত থাকে। ইসলামে সেহেরির গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কেবল দীর্ঘ একটি দিন না খেয়ে থাকার জন্য শরীরে জ্বালানি সরবরাহ করাই নয়, বরং এর মাঝে নিহিত রয়েছে প্রভূত কল্যাণ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সেহেরি খাওয়ার ওপর বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন এবং একে বরকতময় খাবার হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন: "তোমরা সেহেরি খাও, কারণ সেহেরিতে বরকত রয়েছে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯২৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১০৯৫)। এই হাদীসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সেহেরির খাবার গ্রহণ করা নিছক উদরপূর্তি নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকত লাভের একটি মাধ্যম। এই বরকত হতে পারে শারীরিক শক্তি, মানসিক প্রশান্তি কিংবা আধ্যাত্মিক উন্নতি। তাছাড়া সেহেরির সময়টি হলো রাতের শেষ প্রহর, যা তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য সর্বোত্তম সময়। সেহেরি খেতে ওঠার মাধ্যমে মুমিন বান্দা সহজেই এই বরকতময় সময়ে ইবাদত করার সুযোগ লাভ করেন, যা অন্য সময়ে হয়তো কঠিন হয়ে পড়ে।

সেহেরি খাওয়ার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর স্বাতন্ত্র্যও প্রকাশ পায়। আহলে কিতাব তথা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের রোজার সাথে মুসলিমদের রোজার একটি মৌলিক পার্থক্য হলো এই সেহেরি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "আমাদের রোজা এবং আহলে কিতাবদের রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো সেহেরি খাওয়া।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১০৯৬)। অর্থাৎ, সেহেরি গ্রহণ করা মুসলিম সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এর মাধ্যমে আমরা পূর্ববর্তী উম্মতদের প্রথা থেকে নিজেদের ইবাদতকে পৃথক করি। স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও সেহেরির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। সারাদিন উপবাসের ফলে শরীরে যে গ্লুকোজ ও পানির ঘাটতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সেহেরি তা পূরণ করতে সহায়তা করে। এটি রোজাদারকে দিনের বেলায় দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা অতিরিক্ত তৃষ্ণা থেকে রক্ষা করে ইবাদতে মনোনিবেশ করতে সাহায্য করে। সেহেরিতে এমন খাবার নির্বাচন করা উচিত যা ধীরগতিতে হজম হয় এবং দীর্ঘক্ষণ শক্তি যোগায়, যেমন জটিল কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন এবং পর্যাপ্ত পানি। অতিরিক্ত তেল বা মসলাযুক্ত খাবার পরিহার করা স্বাস্থ্যের জন্য উত্তম।

দিনের দীর্ঘ সিয়াম সাধনার সমাপ্তি ঘটে ইফতারের মাধ্যমে। সূর্যাস্ত বা মাগরিবের আজানের সাথে সাথে রোজা ভঙ্গ করার নামই ইফতার। এটি রোজাদারের জন্য এক পরম আনন্দঘন মুহূর্ত। সারাদিন আল্লাহর ভয়ে পানাহার থেকে বিরত থাকার পর যখন একজন মুমিন আল্লাহর নাম নিয়ে খাবার মুখে তোলেন, তখন তা এক অনন্য কৃতজ্ঞতার প্রকাশে পরিণত হয়। ইফতারের ক্ষেত্রেও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও সুন্নাহ রয়েছে। তিনি ইফতার দ্রুত করার নির্দেশ দিয়েছেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "মানুষ কল্যাণের উপর থাকবে, যতক্ষণ তারা ইফতার দ্রুত করবে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯৫৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১০৯২)। অর্থাৎ, সূর্যাস্ত নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথেই দেরি না করে রোজা ভঙ্গ করা কল্যাণকর এবং এটি ইসলামের সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রকৃতির পরিচায়ক। ইফতারের সূচনা খেজুর ও পানি দিয়ে করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ সুন্নাহ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাজা খেজুর, তা না পেলে শুকনো খেজুর এবং তাও না পেলে পানি দিয়ে ইফতার করতেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৩৫৫)। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও দীর্ঘক্ষণ খালি পেটে থাকার পর খেজুরের শর্করা দ্রুত শরীরে শক্তি ফিরিয়ে আনে এবং পানি পানিশূন্যতা দূর করে।

ইফতারের মুহূর্তটি আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে অত্যন্ত মূল্যবান। এটি দোয়া কবুলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়। সারাদিনের ত্যাগ ও ধৈর্যের পর আল্লাহর দরবারে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "রোজাদারের ইফতারের সময় তার দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।" (সুনানে তিরমিযী, হাদীস ৩৫৯৮; ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৭৫২)। তাই ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে গল্পগুজব বা অনর্থক কাজে সময় নষ্ট না করে আল্লাহর কাছে নিজের ইহকালীন ও পরকালীন মঙ্গলের জন্য দোয়া করা উচিত। এছাড়া ইফতারের সামাজিক গুরুত্বও অনেক। পরিবার, পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের নিয়ে একসাথে ইফতার করা মুসলিম সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ, ঐক্য ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি করে। বিশেষ করে অভাবী ও দরিদ্রদের ইফতার করানো বা তাদের সাথে খাবার ভাগ করে নেওয়া ইসলামের এক মহান শিক্ষা, যা রোজার সওয়াবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। পরিশেষে বলা যায়, সেহেরি ও ইফতার কেবল দুটি বেলার খাবার নয়, বরং এগুলো রমজানের আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণের অংশ। সঠিক নিয়মে ও সুন্নাহ মোতাবেক এই দুটি আমল পালনের মাধ্যমে আমরা যেমন শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে পারি, তেমনি আল্লাহর নৈকট্য ও অফুরন্ত বরকত লাভে ধন্য হতে পারি। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

ফিকহ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!