ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে ঈমান ও সালাতের পরেই যাকাতের স্থান। এটি কেবল একটি আর্থিক ইবাদত বা সাধারণ দান নয়, বরং এটি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কর্তৃক নির্ধারিত এক অবশ্যপালনীয় বিধান যা সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং দরিদ্রদের অধিকার নিশ্চিত করার এক ঐশী ব্যবস্থা। যাকাত শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো পবিত্রতা, বৃদ্ধি ও বরকত। শরীয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করাকে যাকাত বলা হয়। অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলিম সঠিক মাসআলা না জানার কারণে যাকাত হিসাব করতে গিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। বিশেষ করে নেসাব নির্ধারণ, সম্পদের ধরণ এবং বর্ষপূর্তির হিসাব নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে। অথচ সঠিক হিসাব না জানার কারণে ইবাদতটি ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে, যা পরকালীন মুক্তির পথে অন্তরায়। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেছেন:
﴿خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "খুয মিন আমওয়ালিহিম সাদাকাতান, তুতাহহিরুহুম ওয়া তুযাক্কীহিম বিহা।" অর্থ: "তাদের সম্পদ থেকে সদকা (যাকাত) গ্রহণ করুন, যার মাধ্যমে আপনি তাদেরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবেন।" (সূরা আত-তওবা, ৯:১০৩)
যাকাত হিসাব করার পূর্বে একজন মুসলিমকে নিশ্চিত হতে হবে যে তার ওপর যাকাত আদৌ ফরজ হয়েছে কিনা। শরীয়তের দৃষ্টিতে যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য ব্যক্তিকে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে, স্বাধীন ও সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হতে হবে এবং নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হতে হবে। এই সম্পদ অবশ্যই বর্ধনশীল হতে হবে, অর্থাৎ যা থেকে লাভ বা বৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যেমন—নগদ অর্থ, স্বর্ণ, রৌপ্য, ব্যবসার পণ্য বা গবাদি পশু। যাকাত ফরজ হওয়ার আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো `হাওলানুল হাওল` বা এক বছর পূর্ণ হওয়া। অর্থাৎ, নেসাব পরিমাণ সম্পদ ব্যক্তির মালিকানায় হিজরি ক্যালেন্ডার বা চান্দ্র মাস অনুযায়ী পূর্ণ এক বছর স্থায়ী হতে হবে। এর পাশাপাশি, ব্যক্তির মৌলিক প্রয়োজন যেমন বাসস্থান, খাবার, পোশাক এবং ঋণের দায় মেটানোর পর যদি অতিরিক্ত সম্পদ নেসাব পরিমাণ থাকে, কেবল তখনই তার ওপর যাকাত ফরজ হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, অনেক সময় আমরা সৌর বছর বা ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী যাকাতের হিসাব করে থাকি, কিন্তু শরীয়ত সম্মত পদ্ধতি হলো চান্দ্র বর্ষ অনুসরণ করা। সৌর বছর চান্দ্র বছরের চেয়ে প্রায় ১১ দিন বড় হওয়ায়, কেউ যদি সৌর বছর অনুযায়ী হিসাব করেন তবে তাকে ২.৫ শতাংশের পরিবর্তে প্রায় ২.৫৮ শতাংশ হারে যাকাত প্রদান করতে হবে, যাতে দরিদ্রের হক নষ্ট না হয়।
যাকাত ফরজ হওয়ার ভিত্তি হলো `নেসাব`, যা শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত সম্পদের নিম্নতম সীমা। স্বর্ণ ও রৌপ্য—এই দুটি মূল্যবান ধাতুর ওপর ভিত্তি করে নেসাব নির্ধারিত হয়। স্বর্ণের ক্ষেত্রে নেসাব হলো সাড়ে সাত তোলা বা প্রায় ৮৭.৪৬ গ্রাম (মতান্তরে ৮৫ গ্রাম) বিশুদ্ধ স্বর্ণ। আর রৌপ্যের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ হলো সাড়ে বায়ান্ন তোলা বা প্রায় ৬১২.৩৬ গ্রাম (মতান্তরে ৫৯৫ গ্রাম) বিশুদ্ধ রৌপ্য। বর্তমান যুগে যেহেতু স্বর্ণ ও রৌপ্যের মূল্যের মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে এবং ফিকহী মূলনীতি হলো গরিবের উপকার সাধন করা, তাই অধিকাংশ ফকিহগণের মতে রৌপ্যের নেসাবকে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ, আপনার কাছে থাকা নগদ অর্থ, ব্যবসার পণ্য বা শেয়ারের মূল্য যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের বর্তমান বাজারমূল্যের সমান বা বেশি হয়, তবে আপনি সাহেবে নেসাব বা যাকাত প্রদানকারী হিসেবে গণ্য হবেন। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের দাম আনুমানিক ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা হয় এবং আপনার কাছে এই পরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি উদ্বৃত্ত অর্থ এক বছর গচ্ছিত থাকে, তবে আপনাকে যাকাত দিতে হবে।
যাকাতের হার অত্যন্ত সুস্পষ্ট, যা মোট যাকাতযোগ্য সম্পদের ২.৫ শতাংশ বা ৪০ ভাগের ১ ভাগ। যাকাতযোগ্য সম্পদের আওতায় পড়ে নগদ অর্থ, ব্যাংক ব্যালেন্স, বন্ড, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার সার্টিফিকেট এবং ফেরত পাওয়ার যোগ্য ঋণ। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গচ্ছিত অর্থ, হোক তা ফিক্সড ডিপোজিট বা সেভিংস অ্যাকাউন্ট, সবকিছুর ওপর যাকাত আসবে। প্রভিডেন্ট ফান্ড বা বীমা পলিসিতে জমানো অর্থ যা আপনি যেকোনো সময় উত্তোলন করতে পারবেন, তাও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। এছাড়া স্বর্ণ ও রৌপ্যের ক্ষেত্রে তা গহনা, বার বা মুদ্রা—যে রূপেই থাকুক না কেন এবং তা ব্যবহারের জন্য হোক বা তুলে রাখার জন্য, যদি তা নেসাব পরিমাণ হয় তবে তার ওপর যাকাত ফরজ হবে। ব্যবসার পণ্যের ক্ষেত্রে দোকানে বিক্রির জন্য রাখা সকল মালামাল, গোডাউনের স্টক, কাঁচামাল এবং ব্যবসার পাওনা অর্থের বর্তমান বাজারমূল্য হিসাব করতে হবে। তবে ব্যবসার কাজে ব্যবহৃত আসবাবপত্র, দালান বা মেশিনারিজের ওপর যাকাত আসবে না। কৃষিজাত ফসলের ক্ষেত্রে যাকাতকে `উশর` বলা হয়। বৃষ্টির পানিতে উৎপাদিত ফসলের ১০ শতাংশ এবং সেচ বা কৃত্রিম উপায়ে উৎপাদিত ফসলের ৫ শতাংশ যাকাত হিসেবে দিতে হয়, যা ফসল কাটার সময়ই আদায়যোগ্য।
যাকাত হিসাব করার প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন করলে তা অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়। প্রথমে আপনাকে একটি নির্দিষ্ট তারিখ নির্বাচন করতে হবে, যা প্রতি বছর আপনি অনুসরণ করবেন, যেমন রমজানের ১ তারিখ। এরপর সেই তারিখে আপনার মালিকানায় থাকা সমস্ত যাকাতযোগ্য সম্পদ একত্রিত করতে হবে। ধরা যাক, একজন ব্যক্তির হাতে নগদ ও ব্যাংকে আছে ৫,০০,০০০ টাকা, নেসাব পরিমাণ স্বর্ণের বর্তমান মূল্য ২,০০,০০০ টাকা, রৌপ্যের মূল্য ৫০,০০০ টাকা, ব্যবসায়িক পণ্যের মূল্য ৩,০০,০০০ টাকা, শেয়ার ও সঞ্চয়পত্র ১,৫০,০০০ টাকা এবং ফেরত পাওয়ার যোগ্য পাওনা ১,০০,০০০ টাকা। তাহলে তার মোট যাকাতযোগ্য সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১২,০০,০০০ টাকা। এখন এই মোট সম্পদ থেকে তার তাৎক্ষণিক ঋণের পরিমাণ বাদ দিতে হবে। যদি তার ২,০০,০০০ টাকা ঋণ থাকে, তবে নিট যাকাতযোগ্য সম্পদ হবে ১০,০০,০০০ টাকা। যেহেতু এই পরিমাণ অর্থ রৌপ্যের নেসাবের (আনুমানিক ৭০,০০০ টাকা) চেয়ে অনেক বেশি, তাই ওই ব্যক্তির ওপর যাকাত ফরজ। ১০,০০,০০০ টাকার ২.৫ শতাংশ হারে তাকে ২৫,০০০ টাকা যাকাত হিসেবে প্রদান করতে হবে।
যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে নিয়ত করা আবশ্যক এবং এটি সঠিক খাতে ব্যয় করা জরুরি। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে যাকাত বন্টনের আটটি সুনির্দিষ্ট খাত উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়কারী কর্মচারী, ইসলামের প্রতি যাদের মন আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, আল্লাহর পথে জিহাদকারী এবং অসহায় মুসাফির অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
﴿إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "ইন্নামাস সাদাকাতু লিল-ফুকারাই ওয়াল-মাসাকীনি ওয়াল-আমিলীনা আলাইহা ওয়াল-মুআল্লাফাতি কুলুবুহুম ওয়া ফির-রিকাবি ওয়াল-গারিমীনা ওয়া ফী সাবিলিল্লাহি ওয়াবনিস-সাবিল।" অর্থ: "যাকাত তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য, যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণভারাক্রান্তদের জন্য, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য।" (সূরা আত-তওবা, ৯:৬০)
নিজের মা-বাবা, দাদা-দাদি (উসুল) এবং সন্তান-সন্ততি বা নাতি-নাতনিকে (ফুরু) যাকাত দেওয়া জায়েজ নয়, কারণ তাদের ভরণপোষণ ব্যক্তির নিজের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। যাকাতের অর্থ ও হিসাব সম্পূর্ণ স্বচ্ছ রাখা ঈমানের দাবি। প্রয়োজনে কোনো অভিজ্ঞ আলেম বা মুফতির পরামর্শ নিয়ে জটিল সম্পদের হিসাব করা উচিত। যাকাত প্রদানের মাধ্যমে মুমিন বান্দা কেবল আল্লাহর নির্দেশই পালন করেন না, বরং এর মাধ্যমে তিনি কৃপণতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পান এবং তার উপার্জিত সম্পদে বরকত নেমে আসে। আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিকভাবে হিসাব করে পূর্ণাঙ্গ যাকাত আদায় করার তাওফিক দান করুন।

আপনার মতামত লিখুন :