বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬ ফাল্গুন ১৪৩২

রোজা অবস্থায় চুল কাটা কি জায়েজ? শরীয়তের সঠিক বিধান জানুন

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬, ১২:০৫ পিএম
রোজা অবস্থায় চুল কাটা কি জায়েজ? শরীয়তের সঠিক বিধান জানুন

রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য এক মহিমান্বিত ও পবিত্র সময় যখন প্রতিটি মুমিন বান্দা সিয়াম সাধনা এবং গভীর ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের নিরন্তর চেষ্টা করেন। এই পবিত্র মাসে ইবাদতের পাশাপাশি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের ছোটখাটো অনেক বিষয় নিয়ে শরীয়তের সঠিক বিধান জানার এক প্রবল কৌতূহল জাগ্রত হয়। বিশেষ করে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অংশ হিসেবে অনেকেই প্রশ্ন করে থাকেন যে রমজান মাসে বা রোজা রাখা অবস্থায় চুল কাটা কি জায়েজ কি না। এই বিষয়টি কি রোজার ওপর কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে নাকি এর পেছনে কোনো ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন বিদ্যমান। অনেক সময় লোকমুখে প্রচলিত ভিত্তিহীন কিছু কথা আমাদের দ্বিধাগ্রস্ত করে তোলে যা আমাদের ইবাদতের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই ইসলামের সুমহান শিক্ষার আলোকে এই বিষয়ে একটি পরিষ্কার এবং গভীর ধারণা রাখা অত্যন্ত জরুরি যাতে আমরা যেকোনো ধরনের অনর্থক দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে রমজানের আমলগুলো চালিয়ে যেতে পারি।

ইসলামী শরীয়তের সুনির্দিষ্ট বিধান অনুযায়ী রমজান মাসে বা রোজা রাখা অবস্থায় শরীরের চুল বা নখ কাটা সম্পূর্ণভাবে জায়েজ এবং এতে রোজার বিন্দুমাত্র কোনো ক্ষতি হয় না। পবিত্র কুরআন বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহীহ হাদীসের কোথাও এমন কোনো বর্ণনা নেই যা রোজা অবস্থায় চুল কাটাকে নিষিদ্ধ বা মাকরূহ হিসেবে চিহ্নিত করে। এটি এমন কোনো কাজ নয় যা রোজা ভঙ্গের কারণ হতে পারে কিংবা রোজার সওয়াব বা গুরুত্বকে কমিয়ে দিতে পারে। মূলত রোজা ভঙ্গের কারণগুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট যা আমাদের ফিকহ শাস্ত্রের কিতাবসমূহে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। রোজা ভঙ্গের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে দিনের বেলায় ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো কিছু পানাহার করা কিংবা স্ত্রী সহবাসে লিপ্ত হওয়া। এছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে মুখভর্তি বমি করা কিংবা এমন কোনো ইনজেকশন বা ওষুধ গ্রহণ করা যা খাদ্যের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে কেবল সেগুলোই রোজা নষ্টের কারণ হতে পারে। এই তালিকায় চুল কাটা বা শরীরের কোনো অংশ পরিষ্কার করার মতো কোনো বিষয় অন্তর্ভুক্ত নেই।

আমাদের সমাজের একটি বিশাল অংশে কিছু ভুল ধারণা বা কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে যার সাথে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই। অনেকেই মনে করেন যে রোজা রেখে চুল কাটলে বা নখ কাটলে শরীরের পবিত্রতা নষ্ট হয় অথবা রোজা হালকা হয়ে যায়। এই ধরনের ধারণাগুলো সম্পূর্ণ ভ্রান্ত এবং এর কোনো ভিত্তি কুরআন বা সুন্নাহর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে ইসলাম পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে বলেন: ﴿إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "ইন্নাল্লাহা ইয়ুহিব্বুত তাউওয়াবীনা ওয়া ইয়ুহিব্বুল মুতাতাহহিরীন।" অর্থ: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন।" (সূরা আল-বাকারা, ২:২২২) এই আয়াত থেকে এটি স্পষ্ট যে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি অন্যতম মাধ্যম। রোজা অবস্থায়ও এই পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা মুমিনের জন্য সুন্নাহর অনুগামী হওয়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসতেন এবং তিনি সাহাবায়ে কেরামকেও নিজেদের শরীর ও পোশাক পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ দিতেন।

সমাজে এই ধরনের ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে সঠিক ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব। মানুষ যখন কুরআন ও সুন্নাহর প্রকৃত উৎস থেকে জ্ঞান অর্জন না করে কেবল লোকমুখে শোনা কথাকে ধর্মীয় বিধান হিসেবে গ্রহণ করে নেয় তখনই এই ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়। অনেকে ইবাদতে অতিমাত্রায় কঠোরতা বা বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে এমন সব বিষয়কে নিষিদ্ধ মনে করেন যা আসলে শরীয়ত দ্বারা বৈধ। অথচ দ্বীন ইসলামকে অত্যন্ত সহজ করা হয়েছে যাতে মানুষ স্বাভাবিকভাবে তাদের জীবন পরিচালনা করতে পারে। রমজান মাসে আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কুরআন তেলাওয়াত, যিকির-আযকার, সালাত এবং দান-সাদাকাহর মাধ্যমে আত্মিক উন্নতি ঘটানো। এই সময় অনর্থক কুসংস্কারের পেছনে সময় নষ্ট না করে সঠিক মাসআলা জেনে নিয়ে সে অনুযায়ী আমল করা উচিত। চুল কাটা বা নখ কাটার মতো দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজগুলো রোজার আধ্যাত্মিক পবিত্রতাকে বিঘ্নিত করে না বরং এটি মানুষের শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

সুতরাং ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সুনিশ্চিত যে রমজানের যেকোনো দিনে বা রোজা রাখা অবস্থায় দিনের বেলা চুল কাটাতে কোনো প্রকার ধর্মীয় বাধা নেই। যারা সেলুন বা বিউটি পার্লারের সাথে পেশাগতভাবে জড়িত তাদের জন্যও রমজান মাসে এই সেবা প্রদান করা সম্পূর্ণ বৈধ এবং এটি কোনো গুনাহের কাজ নয়। আমাদের উচিত এসব ভিত্তিহীন ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্যের দিকে অগ্রসর হওয়া। যেকোনো মাসআলা নিয়ে মনে সংশয় দেখা দিলে নির্ভরযোগ্য আলেমদের শরণাপন্ন হয়ে সঠিক সমাধান জেনে নেওয়া ঈমানী দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সহীহ জ্ঞান দান করুন এবং সকল প্রকার কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে তাঁরই প্রদর্শিত পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

ফিকহ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!