বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬ ফাল্গুন ১৪৩২

রমজানে যাকাত আদায়ের বিশেষ সওয়াব ও শরীয়তের সঠিক বিধান

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬, ১২:১০ পিএম
রমজানে যাকাত আদায়ের বিশেষ সওয়াব ও শরীয়তের সঠিক বিধান

রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য ইবাদত-বন্দেগি, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গণ্য হয়। এই পবিত্র মাসে মুমিন বান্দারা সিয়াম সাধনার মাধ্যমে নিজেদের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান লাভের আশায় ব্যাকুল থাকে। রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত বরকতময় এবং এই সময়ে যে কোনো ইবাদতের সওয়াব অন্যান্য সময়ের তুলনায় বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। যাকাত ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম একটি স্তম্ভ যা একজন নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক মুসলিমের ওপর ফরয করা হয়েছে। যাকাত মূলত সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ যা আল্লাহর নির্ধারিত আটটি খাতে ব্যয় করতে হয়। যদিও যাকাত আদায়ের মূল শর্ত হলো সম্পদ নেসাবে পৌঁছানোর পর এক পূর্ণ চন্দ্র বছর অতিবাহিত হওয়া তবে আমাদের সমাজে রমজান মাসকে যাকাত আদায়ের জন্য বিশেষভাবে বেছে নেওয়া হয়। এর পেছনে যেমন গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে তেমনি রয়েছে ফিকহী ও সামাজিক যৌক্তিকতা। যাকাত কেবল দরিদ্রের প্রতি করুণা নয় বরং এটি তাদের প্রাপ্য অধিকার যা ধনীর সম্পদে মহান আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

যাকাত আদায়ের জন্য ইসলামী শরীয়তে হাউলানুল হাউল বা এক বছর পূর্ণ হওয়ার শর্ত আরোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ যেদিন আপনার সম্পদ নেসাব পরিমাণ হবে সেদিন থেকে ঠিক এক চন্দ্র বছর পর আপনার ওপর সেই সম্পদের যাকাত আদায় করা ওয়াজিব হবে। এটি বছরের যেকোনো মাসেই হতে পারে। কিন্তু রমজান মাসের বিশেষ ফজিলত এবং মর্যাদা এই ফরয ইবাদতটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন: ﴿وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللَّهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "ওয়া আকীমুস সালাতা ওয়া আতুয যাকাতা ওয়া মা তুকাদ্দিমূ লি আনফুসিকুম মিন খাইরিন তাজিদূহু ইনদাল্লাহ; ইন্নাল্লাহা বিমা তা’মালূনা বাসীর।" অর্থ: "আর তোমরা সালাত কায়েম করো ও যাকাত প্রদান করো। তোমরা নিজেদের জন্য অগ্রিম যে সৎকর্ম পাঠাবে, আল্লাহর কাছে তা পাবে। তোমরা যা করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা দেখছেন।" (সূরা আল-বাকারা, ২:১১০) এই আয়াতটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে যাকাত প্রদান করা সালাতের মতোই গুরুত্বপূর্ণ এবং এর মাধ্যমে আমরা আখিরাতের জন্য সঞ্চয় করছি।

রমজান মাসে যাকাত আদায়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো সওয়াবের আধিক্য। হাদীস শাস্ত্রের অন্যতম গ্রন্থ শুয়াবুল ঈমানে বর্ণিত হয়েছে যে রমজান মাসে কোনো ফরয ইবাদত আদায় করলে অন্য মাসের সত্তরটি ফরযের সমান সওয়াব পাওয়া যায় (শুয়াবুল ঈমান, হাদীস ৩৬০৯)। যাকাত যেহেতু একটি ফরয ইবাদত তাই রমজানে এটি আদায় করলে বান্দা সত্তর গুণ বেশি সওয়াব লাভের সুযোগ পায়। একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে। এছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাসে দান-সাদাকাহর ক্ষেত্রে ছিলেন প্রবহমান বাতাসের মতো উদার। সহীহ বুখারীর ১৯০২ নম্বর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম যখন রমজানে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন তখন তিনি অত্যন্ত দানশীল হয়ে উঠতেন। রাসূলের এই সুন্নাহ অনুসরণ করে যুগ যুগ ধরে মুসলিমরা রমজান মাসকে তাদের যাকাত আদায়ের সময় হিসেবে নির্ধারণ করে আসছে। এটি কেবল একটি প্রথা নয় বরং এটি রাসূলের ভালোবাসার এক বহিঃপ্রকাশ।

সামাজিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে রমজান মাসে অভাবী ও দরিদ্র মানুষের প্রয়োজন অনেক বেড়ে যায়। সিয়াম পালন করার জন্য সাহরি ও ইফতারের আয়োজন এবং রমজান শেষে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপনের জন্য বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হয়। রমজান মাসে যাকাত আদায় করলে অভাবী মুসলিমরা তাদের মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটাতে পারে এবং অন্যদের মতো তারাও আনন্দের সাথে ঈদ পালন করতে পারে। এই সহানুভূতি ও সহমর্মিতা রমজানের প্রকৃত শিক্ষার সাথে মিশে আছে। যখন একজন সম্পদশালী ব্যক্তি তার যাকাতের অর্থ রমজানে কোনো দুস্থ পরিবারের হাতে তুলে দেন তখন সেই পরিবারটির মুখে যে হাসি ফোটে তা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। এটি কেবল সম্পদের পবিত্রতা নয় বরং এটি একটি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনের অন্যতম হাতিয়ার। যাকাত সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে।

অনেকে প্রশ্ন করেন যে যদি যাকাত বর্ষ রমজানের আগে বা পরে পূর্ণ হয় তবে কী করণীয়। ফিকহ শাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী যাকাত যখনই ফরয হবে তখনই তা আদায় করা ওয়াজিব। তবে বরকতময় রমজানের সওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে কেউ যদি তার যাকাত অগ্রিম আদায় করে দেয় তবে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ জায়েজ। ধরুন কারো যাকাত বর্ষ শাওয়াল মাসে পূর্ণ হবে কিন্তু তিনি রমজানেই তা আদায় করে দিলেন। এতে তিনি যেমন যাকাতের দায় থেকে মুক্ত হলেন তেমনি রমজানের বিশেষ ফজিলতও অর্জন করলেন। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো যাকাত আদায়ের সময় সম্পদ নেসাব পরিমাণ থাকতে হবে। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে মানুষের অন্তর কৃপণতা ও লোভ থেকে মুক্ত হয় এবং আত্মিক পরিশুদ্ধি অর্জিত হয়। এটি মানুষের সম্পদের বরকত বৃদ্ধি করে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণের পথ প্রশস্ত করে।

যাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে সঠিক হিসাব রাখা অত্যন্ত জরুরি। স্বর্ণ, রৌপ্য, নগদ অর্থ এবং ব্যবসার পণ্যের ওপর যাকাত ফরয হয়। বর্তমান যুগে যাকাত ক্যালকুলেটর বা অভিজ্ঞ আলেমদের পরামর্শ নিয়ে নিখুঁতভাবে যাকাত বের করা উচিত। যাকাত নির্দিষ্ট আটটি খাতে ব্যয় করতে হয় যার মধ্যে ফকির, মিসকিন এবং ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিরা অন্যতম। এই খাতগুলো পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। রমজান মাসে যখন আমরা নিজেদের পাপ মোচনের জন্য আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করি তখন যাকাত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্টির সেবা করা আমাদের দোয়ার কবুলিয়াতকে ত্বরান্বিত করতে পারে। পরিশেষে এটি বলা যায় যে রমজান যাকাত আদায়ের জন্য কোনো বাধ্যবাধকতামূলক মাস না হলেও এটি ইবাদতের গুণগত মান এবং সওয়াবের পরিমাণের দিক থেকে সর্বোত্তম সময়। সম্পদের মোহ ত্যাগ করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তার পথে ব্যয় করাই হলো মুমিনের প্রকৃত পরিচয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সম্পদকে যাকাতের মাধ্যমে পবিত্র করার এবং রমজানের পূর্ণ বরকত লাভের তাওফিক দান করুন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

ফিকহ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!