বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬ ফাল্গুন ১৪৩২

রমজান: হারানো জান্নাত ও আদমের উত্তরাধিকার ফিরে পাওয়ার মাস

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬, ১১:৩৫ এএম
রমজান: হারানো জান্নাত ও আদমের উত্তরাধিকার ফিরে পাওয়ার মাস

আদমের উত্তরাধিকার ও জান্নাতের সন্ধানে / Ai

পবিত্র রমজান মাস আমাদের সামনে প্রতি বছর যখন ফিরে আসে, তখন আমরা অনেকেই একে কেবল উপবাস বা ক্ষুধার্ত থাকার একটি মাস হিসেবে দেখি। কিন্তু গভীর তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায় যে, এই মাসটি মানবজাতির অস্তিত্বের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রমজানের সিয়াম সাধনা মূলত আমাদের আদি পিতা আদম আলাইহিস সালামের সেই হারানো জান্নাতের উত্তরাধিকার ফিরে পাওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারায় রমজানের বিধান বর্ণনা করার ঠিক আগেই আদম আলাইহিস সালামের সৃষ্টির প্রেক্ষাপট তৈরি করেছেন। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জান্নাত কেবল একটি পুরস্কার নয় বরং এটি আমাদের পৈত্রিক সম্পত্তি। সূরা আল-মুমিনুনে আল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে মুমিনরা হলো সেই উত্তরাধিকারী যারা জান্নাতুল ফিরদাউসের মালিক হবে (সূরা আল-মুমিনুন, ২৩:১০-১১)। আমরা যেমন পৃথিবীতে মা-বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হই, তেমনি জান্নাত হলো আমাদের আদি পিতার আদি বাসস্থান যা ফিরে পাওয়া আমাদের জীবনের মূল লক্ষ্য।

জান্নাতে থাকাকালীন আদম আলাইহিস সালামের জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামত কেবল ফলমূল বা অট্টালিকা ছিল না, বরং সবচেয়ে বড় গৌরব ছিল মহান আল্লাহর সাথে তাঁর সরাসরি কথোপকথনের সুযোগ। আল্লাহ সরাসরি তাঁকে নির্দেশ দিতেন এবং উপদেশ দিতেন যা ছিল জান্নাতের শ্রেষ্ঠ উপহার। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় যখন তিনি সেই ভুলটি করে বসলেন, তখন তাঁর সবচেয়ে বড় শাস্তি জান্নাত থেকে বহিষ্কার হওয়া ছিল না। বরং সবচেয়ে বড় কষ্টের বিষয় ছিল আল্লাহর সাথে সেই সরাসরি ও মধুর কথোপকথনের সংযোগটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। আল্লাহ যখন তাঁদের পৃথিবীতে নেমে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন, তখন আদম আলাইহিস সালাম কেবল একটি উদ্যান হারাননি বরং তিনি তাঁর রবের সেই প্রত্যক্ষ সান্নিধ্য হারিয়েছিলেন। এটি ছিল এক বিশাল পদাবনতি যা তাঁকে এক সংগ্রামমুখর পৃথিবীতে নিয়ে এসেছিল। অনেকে মনে করেন আদম আলাইহিস সালামকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে শাস্তি হিসেবে, কিন্তু ইসলাম এই ধারণাকে নাকচ করে দেয়। পৃথিবী কোনো অভিশপ্ত জায়গা নয় বরং এটি আল্লাহর এক অপরূপ সৃষ্টি যেখানে তিনি আমাদের জন্য জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন (সূরা আল-আরাফ, ৭:১০)। পৃথিবী আসলে জান্নাতেরই একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ যা আমাদের আখেরাতের নিয়ামতগুলোর কদর বুঝতে শেখায়।

আদম আলাইহিস সালাম জান্নাতের সেই নিশ্চিন্ত জীবন ছেড়ে যখন এই পৃথিবীতে এলেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই তাঁর রবের সেই সান্নিধ্যকে ভীষণভাবে মিস করতেন। এই বিচ্ছেদ ও দূরত্বের বেদনা যখন তাঁকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, তখন আল্লাহ তাঁকে এক মহান প্রতিশ্রুতি দিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন যে তাঁর পক্ষ থেকে যখন হেদায়েত আসবে, যারা তা অনুসরণ করবে তাদের কোনো ভয় থাকবে না (সূরা আল-বাকারা, ২:৩৮)। এই প্রতিশ্রুতির চূড়ান্ত ও সর্বশ্রেষ্ঠ রূপ হলো পবিত্র কুরআন যা রমজান মাসে নাযিল করা হয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে যে হেদায়েতের ধারা চলে আসছিল, তা রমজানে কুরআন নাযিলের মাধ্যমে পূর্ণতা পেল। রমজানের সাথে এই ইতিহাসের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর কারণ এই মাসে আল্লাহ তাঁর সেই রশি বা হাবলুল্লাহ আকাশ থেকে দুনিয়াতে ঝুলিয়ে দিয়েছেন যা হলো আল-কুরআন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে কুরআন হলো আল্লাহর রশি যার এক প্রান্ত আল্লাহর হাতে এবং অন্য প্রান্ত বান্দার হাতে (মুসনাদে আহমাদ)।

রমজান মাসে আমরা যখন কুরআন তিলাওয়াত করি, তখন মূলত আল্লাহ আমাদের সাথে কথা বলেন এবং আমরা যখন দোয়া করি তখন আমরা আল্লাহর সাথে কথা বলি। এভাবেই রমজান মাসে সেই হারানো কথোপকথন বা কনভারসেশন আবার পুনর্স্থাপিত হয়। জান্নাতে আদম আলাইহিস সালাম যেমন আল্লাহর খুব কাছে ছিলেন, রমজান মাসে একজন রোজাদারও আল্লাহর ঠিক তেমনই কাছে চলে আসে। সূরা বাকারার ১৮৬ নং আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে যখন তাঁর বান্দারা তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তিনি অত্যন্ত কাছে এবং তিনি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেন (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৬)। এই আয়াতে আল্লাহ কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন রাখেননি যা প্রমাণ করে যে তিনি বান্দার কতটা নিকটবর্তী। আল্লাহ এখানে কোনো কঠিন শর্ত দেননি বরং কেবল ডাকার মতো ডাকলে তিনি যেকোনো পাপী বান্দার দোয়া কবুল করেন। শয়তানের অন্যতম বড় কাজ হলো মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করা। কিন্তু আমাদের পিতা আদম আলাইহিস সালাম ভুল করার পর নিরাশ হননি বরং তিনি তওবা করেছিলেন এবং আল্লাহর ক্ষমা ভিক্ষা করেছিলেন (সূরা আল-আরাফ, ৭:২৩)।

রমজান মাস হলো সেই তওবা করার এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার শ্রেষ্ঠ সময়। আল্লাহ এই মাসে শয়তানকে শিকলবদ্ধ করে রাখেন যাতে আমরা বিভ্রান্ত না হই। তিনি চান আমরা যেন কুরআনের মাধ্যমে তাঁর কথা শুনি এবং দোয়ার মাধ্যমে আমাদের কথা তাঁকে শোনাই। এই দ্বিমুখী কথোপকথনই হলো রমজানের প্রাণ। দোয়া করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট ভাষা বা ব্যাকরণগত শুদ্ধতার প্রয়োজন নেই বরং অন্তরের আবেগ ও আকুতিই আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট। তিনি অন্তর্যামী এবং বান্দার মনের ভাষা বোঝেন। রমজান আমাদের শেখায় যে আমরা এই দুনিয়ার স্থায়ী বাসিন্দা নই বরং আমাদের আসল বাড়ি হলো জান্নাত। এই দুনিয়া কেবল একটি ট্রানজিট বা পরীক্ষার হল যেখানে আমরা আমাদের জান্নাতের অধিকার ফিরে পাওয়ার পরীক্ষা দিচ্ছি। মুমিনের প্রকৃত সফলতা হলো আগুনের শাস্তি থেকে বেঁচে জান্নাতের উত্তরাধিকারী হওয়া। তাই এই রমজানকে কেবল প্রথাগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। আমাদের প্রতিটি সিজদা ও তিলাওয়াত যেন আরশের মালিকের কাছে কবুল হয় এবং আমরা যেন হারানো জান্নাত ফিরে পাওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে যাই।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

কোরআন বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!