বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬ ফাল্গুন ১৪৩২

জিনা ও অবৈধ সম্পর্কের ভয়াবহতা: পরকালীন মুক্তির পথে বড় অন্তরায়

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম
জিনা ও অবৈধ সম্পর্কের ভয়াবহতা: পরকালীন মুক্তির পথে বড় অন্তরায়

পবিত্রতা ও নৈতিকতার জয় / Ai

মানুষের সামাজিক ও আত্মিক জীবনের চরম অবক্ষয়ের এক সন্ধিক্ষণে আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন যে তোমরা জিনার ধারের কাছেও যেও না কারণ এটি অত্যন্ত অশ্লীল কাজ এবং একটি মন্দ পথ (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৩২)। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো আল্লাহ কেবল জিনা বা ব্যভিচার করতে নিষেধ করেননি বরং এর নিকটবর্তী হতেও বারণ করেছেন। জিনার নিকটবর্তী হওয়া বলতে সেই সব প্রারম্ভিক কাজকে বোঝানো হয়েছে যা মানুষকে চূড়ান্ত পাপাচারের দিকে ধাবিত করে। বর্তমান সমাজে আধুনিকতার ছদ্মবেশে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে তা মূলত এই ঐশী সতর্কবার্তার চরম লঙ্ঘন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পাবলিক প্লেস পর্যন্ত সর্বত্র যে দৃশ্যগুলো আমরা প্রত্যক্ষ করি তা মুমিনের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। ক্লাসরুমের বেঞ্চে পাশাপাশি বসে ঘনিষ্ঠ হওয়া কিংবা পার্কে বা কফি শপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একান্তে সময় কাটানো—এই প্রতিটি কাজই মূলত জিনার দিকে যাওয়ার একেকটি ধাপ। বর্তমান যুগের ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে মেসেঞ্জার বা সোশ্যাল মিডিয়ায় রাত জেগে অনর্থক ফোনালাপ ও চ্যাটিং মূলত সেই ‍‍`ফাহিশা‍‍` বা অশ্লীলতারই অংশ যা থেকে ইসলাম আমাদের কঠোরভাবে দূরে থাকতে বলেছে।

আজকের যুবসমাজ প্রায়ই শয়তানের এক সুনিপুণ ধোঁকার শিকার হচ্ছে। তারা মনে করে যে তারা তাদের নফস বা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম এবং তারা কেবল একটু কথা বলা বা দেখা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু মানুষের নফস সম্পর্কে আল্লাহর বাণী অত্যন্ত স্পষ্ট যে মানুষের নফস সর্বদা খারাপ কাজের নির্দেশ দিয়ে থাকে যদি না আল্লাহর বিশেষ দয়া থাকে (সূরা ইউসুফ, ১২:৫৩)। জিনার পথে প্রথম কদম বাড়ানো মানেই হলো নিজেকে এক অতল গহ্বরের দিকে ঠেলে দেওয়া যেখান থেকে ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন। আমাদের সমাজে আজ অদ্ভুত এক দ্বিমুখী আচরণ লক্ষ্য করা যায় যেখানে আমরা মুখে নিজেদের নবীপ্রেমিক দাবি করি কিন্তু কর্মে প্রতিনিয়ত নবীর সুন্নাত ও আদর্শকে প্রত্যাখ্যান করি। সহীহ বুখারীর একটি হাদিস আমাদের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা বহন করে যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে তাঁর সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে কেবল সেই ব্যক্তি ব্যতীত যে জান্নাতে যেতে অস্বীকার করেছে। সাহাবায়ে কিরাম অবাক হয়ে যখন সেই হতভাগার পরিচয় জানতে চাইলেন তখন নবীজি স্পষ্টভাবে বললেন যে ব্যক্তি তাঁর আনুগত্য করল সে জান্নাতে প্রবেশ করল আর যে তাঁর অবাধ্য হলো সেই মূলত জান্নাতে যেতে অস্বীকার করল (সহীহ বুখারী, ৭২৮০)। এই অবাধ্যতার মধ্যে জিনা ও অবৈধ সম্পর্কের মতো কবিরা গুনাহগুলো অন্যতম যা একজন মুমিনকে জান্নাতের পথ থেকে বিচ্যুত করে দেয়।

বর্তমান সময়ের অভিভাবক মহলের উদাসীনতাও এই নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য বহুলাংশে দায়ী। অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের জাগতিক ক্যারিয়ার নিয়ে যতটা চিন্তিত তাদের আখেরাত নিয়ে ততটাই উদাসীন। তারা হয়তো সন্তানকে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বানানোর জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন কিন্তু সন্তানকে দ্বীন শেখানোর জন্য বিন্দুমাত্র সময় বা শ্রম ব্যয় করতে রাজি নন। দেখা যায় যে অনেক পিতা তার ছেলের মুখে দাড়ি দেখলে বিচলিত হন কিন্তু সেই ছেলে যখন অবৈধ প্রেমে জড়িয়ে পড়ে তখন তিনি সেটাকে বয়সের দোষ বলে হালকাভাবে দেখেন। এটি একটি মারাত্মক ভুল ধারণা কারণ আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন (সহীহ বুখারী, ৭১৩৮)। কিয়ামতের সেই ভয়াবহ দিবসের কথা আমাদের বিস্মৃত হওয়া উচিত নয় যেখানে ধন-সম্পদ বা প্রভাব-প্রতিপত্তি কোনো কাজে আসবে না। সেদিন কেবল সেই ব্যক্তি মুক্তি পাবে যে আল্লাহর কাছে আসবে সুস্থ ও পবিত্র অন্তর বা ‍‍`কালবুন সেলিম‍‍` নিয়ে (সূরা আশ-শুআরা, ২৬:৮৮-৮৯)। সুস্থ অন্তর হলো সেই অন্তর যা শিরক ও নিফাক থেকে মুক্ত এবং যা সর্বদা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যে মগ্ন থাকে। অথচ আমরা দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সুখের নেশায় আমাদের অন্তরকে পাপের কালিমায় কলুষিত করে ফেলেছি।

মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় অত্যন্ত ঘনিয়ে এসেছে অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে আছে (সূরা আল-অাম্বিয়া, ২১:১)। অনেকে মনে করেন মৃত্যু অনেক দূরে এবং বৃদ্ধ বয়সে তওবা করে নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে কিন্তু মৃত্যু কোনো নির্দিষ্ট বয়সের ধার ধারে না। শক্তিশালী ও সুঠাম দেহের অধিকারী অনেক যুবককেও আমরা দেখেছি যারা হঠাৎ করেই কবরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দী হয়েছে। কিয়ামতের দিন অপরাধীদের অবস্থা এতটাই করুণ হবে যে তারা নিজেদের মুক্তির জন্য তাদের সবচেয়ে আদরের সন্তান, স্ত্রী এবং আত্মীয়-স্বজনকেও মুক্তিপণ হিসেবে জাহান্নামে দিতে চাইবে (সূরা আল-মাআরিজ, ৭০:১১-১৪)। আল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে সেই লেলিহান আগুন চামড়া ঝলসিয়ে দেবে এবং সেখান থেকে পালানোর কোনো উপায় থাকবে না (সূরা আল-মাআরিজ, ৭০:১৫-১৬)। জাহান্নামের লঘুতম শাস্তি হিসেবে যখন একজনের পায়ের নিচে আগুনের কয়লা রাখা হবে যার তাপে মগজ ফুটতে থাকবে (সহীহ বুখারী, ৬৫৬১), তখন যারা জিনা ও অবৈধ সম্পর্কের মতো গুরুতর পাপে লিপ্ত তাদের শাস্তি কতটা ভয়াবহ হবে তা কল্পনা করাও দুষ্কর।

যুবক ও যুবতীদের প্রতি উম্মাহ কণ্ঠের আকুল আবেদন হলো তোমরা শয়তানের এই মায়াজালে পা দিয়ে নিজেদের জীবন ধ্বংস করো না। যে পুরুষ তোমাকে বিয়ের আগে স্পর্শ করতে চায় সে আসলে তোমাকে ভালোবাসে না বরং সে তোমাকে কেবল ভোগের বস্তু মনে করে। একজন প্রকৃত মুমিন কখনোই বিয়ের আগে কোনো নারীর দিকে কুদৃষ্টি দেয় না বরং সে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং আল্লাহর বিধান মেনে হালাল উপায়ে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করে। মনে রাখা উচিত আল্লাহ যা হারাম করেছেন তার মধ্যে কেবল অশান্তি ও ধ্বংসই নিহিত। কিয়ামতের দিন আমাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে এবং আল্লাহ সেদিন মানুষের মুখে মোহর মেরে দেবেন (সূরা ইয়াসিন, ৩৬:৬৫)। সুতরাং সময় থাকতে ফিরে আসা এবং তওবা করে আল্লাহর পথে নিজেকে সঁপে দেওয়া জরুরি। যে যুবক বা যুবতী তার যৌবনকালকে আল্লাহর ইবাদতে ও পবিত্রতার সাথে অতিবাহিত করবে কিয়ামতের সেই কঠিন দিনে তারা আল্লাহর আরশের নিচে প্রশান্ত ছায়া পাবে (সহীহ বুখারী, ৬৬০)। আমাদের উচিত গান-বাজনা ও অশ্লীলতার অন্ধকার থেকে মুক্ত হয়ে কুরআনের আলোয় হৃদয়কে আলোকিত করা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে জিনা ও ব্যভিচারের মতো জঘন্য পাপ থেকে রক্ষা করুন এবং আমাদের ঈমানকে মজবুত করে খাঁটি মুসলিম হিসেবে মৃত্যুবরণ করার তৌফিক দিন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

পরিবার বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!