বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬ ফাল্গুন ১৪৩২

যাকাত আদায়ের সঠিক নিয়ম: কাদেরকে যাকাত দেওয়া যাবে আর কাদেরকে যাবে না?

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬, ১২:২৩ পিএম
যাকাত আদায়ের সঠিক নিয়ম: কাদেরকে যাকাত দেওয়া যাবে আর কাদেরকে যাবে না?

আমরা বর্তমানে এমন এক সমাজে বসবাস করছি যেখানে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা প্রকট আকার ধারণ করছে। এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই প্রশ্ন করেন যে, ইসলাম কি কেবলই ব্যক্তিগত ইবাদত-বন্দেগির ধর্ম, নাকি এর মধ্যে সমাজ ও অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষার কোনো সুমহান নির্দেশনা রয়েছে? ইসলামের এই প্রশ্নের উত্তরই হলো ‍‍`যাকাত‍‍`। যাকাত কেবল কোনো সাধারণ দান বা অনুদান নয়, বরং এটি একটি গভীর ঐশী বিধান এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা যা মহান আল্লাহ স্বয়ং নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে ঈমান ও সালাতের পরেই যাকাতের স্থান, যা এর অপরিসীম গুরুত্বকে প্রমাণ করে। যাকাত শব্দটি আরবি, যার আভিধানিক অর্থ হলো বৃদ্ধি পাওয়া, পবিত্র হওয়া, পরিশুদ্ধ হওয়া বা বরকত লাভ করা। শরীয়তের পরিভাষায়, নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক কোনো মুসলিম ব্যক্তির ওপর আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ, যা বছরান্তে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে দরিদ্র ও অভাবী মানুষের মাঝে বন্টন করা হয়, তাকেই যাকাত বলে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বহু স্থানে সালাত কায়েমের পাশাপাশি যাকাত আদায়ের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ইরশাদ করেন:

﴿وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ ۚ وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللَّهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "ওয়া আকিমুস সালাতা ওয়া আতুয যাকাতা, ওয়ামা তুকাদ্দিমু লিআনফুসিকুম মিন খাইরিন তাজিদুহু ইন্দাল্লাহি; ইন্নাল্লাহা বিমা তা‍‍`মালুনা বাসির।" অর্থ: "আর তোমরা সালাত কায়েম করো এবং যাকাত দাও। তোমরা নিজেদের জন্য ভালো যা কিছু অগ্রে পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে। নিশ্চয়ই তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখছেন।" (সূরা আল-বাকারা, ২:১১০)

যাকাত প্রদানের মাধ্যমে একজন মুমিনের সম্পদ যেমন পবিত্র হয়, তেমনি তার অন্তরে থাকা সম্পদের মোহ ও কৃপণতা দূর হয়। এটি ধনীদের অহংকার থেকে মুক্ত করে এবং সমাজের অবহেলিত শ্রেণীর প্রতি তাদের মনে সহানুভূতি ও ভালোবাসার সঞ্চার করে। তবে যাকাত আদায় করা সবার জন্য আবশ্যক নয়, এর জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রথমত, যাকাতদাতাকে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে; অমুসলিমদের ওপর যাকাত ফরজ নয়। দ্বিতীয়ত, তাকে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হতে হবে। নেসাব হলো শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত সম্পদের সেই নিম্নতম সীমা, যার মালিক হলে যাকাত ওয়াজিব হয়। স্বর্ণের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ হলো সাড়ে সাত তোলা (প্রায় ৮৭.৪৬ গ্রাম) এবং রৌপ্যের ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন তোলা (প্রায় ৬১২.৩৬ গ্রাম) অথবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ বা ব্যবসায়িক পণ্য। তৃতীয়ত, এই সম্পদ অবশ্যই বর্ধনশীল হতে হবে, অর্থাৎ যা থেকে লাভ বা বৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। চতুর্থত, নেসাব পরিমাণ সম্পদ ব্যক্তির মালিকানায় পূর্ণ এক চান্দ্র বছর বা হিজরি বর্ষ অতিবাহিত হতে হবে, যাকে শরীয়তের পরিভাষায় ‍‍`হাওলানুল হাওল‍‍` বলা হয়। সবশেষে, ব্যক্তির মৌলিক প্রয়োজন এবং ঋণের দায় মেটানোর পরই কেবল অবশিষ্ট সম্পদের ওপর যাকাত ফরজ হবে। যারা যাকাত আদায় করে না, তাদের জন্য পরকালে কঠোর শাস্তির হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে মুশরিকদের সাথে তুলনা করে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন:

﴿وَوَيْلٌ لِلْمُشْرِكِينَ * الَّذِينَ لَا يُؤْتُونَ الزَّكَاةَ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "ওয়া ওয়াইলুল লিল-মুশরিকীন। আল্লাযীনা লা ইউ‍‍`তুনাস যাকাতা..." অর্থ: "আর ধ্বংস সেই মুশরিকদের জন্য, যারা যাকাত প্রদান করে না।" (সূরা ফুস্সিলাত, ৪১:৬-৭)

যাকাত ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বন্টন ব্যবস্থা। আমরা ইচ্ছে করলেই যাকে তাকে যাকাত দিতে পারি না। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তওবার ৬০ নম্বর আয়াতে যাকাত ব্যয়ের আটটি সুনির্দিষ্ট খাত নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই আয়াতটি যাকাত বন্টনের মূল ভিত্তি। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:

﴿إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "ইন্নামাস সাদাকাতু লিল-ফুকারাই ওয়াল-মাসাকীনি ওয়াল-আমিলীনা আলাইহা ওয়াল-মুআল্লাফাতি কুলুবুহুম ওয়া ফির-রিকাবি ওয়াল-গারিমীনা ওয়া ফী সাবিলিল্লাহি ওয়াবনিস-সাবিল; ফারীদাতাম মিনাল্লাহি, ওয়াল্লাহু আলীমুন হাকীম।" অর্থ: "যাকাত তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য, যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণভারাক্রান্তদের জন্য, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।" (সূরা আত-তওবা, ৯:৬০)

উক্ত আয়াতে বর্ণিত আটটি খাতের প্রথমটি হলো ‍‍`ফকির‍‍`, যারা এমন নিঃস্ব ব্যক্তি যাদের জীবন ধারণের জন্য ন্যূনতম সম্পদ নেই এবং তারা চরম দারিদ্র্যে দিনাতিপাত করে। দ্বিতীয় খাত হলো ‍‍`মিসকিন‍‍`, যাদের কিছু সম্পদ থাকলেও তা তাদের এবং পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তৃতীয় খাত হলো যাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী, যারা যাকাত সংগ্রহ ও বন্টন কার্যক্রম পরিচালনা করেন; তাদের বেতন এই তহবিল থেকে দেওয়া বৈধ। চতুর্থ খাত হলো যাদের মন জয় করা উদ্দেশ্য, অর্থাৎ নওমুসলিমদের ঈমান সুদৃঢ় করার জন্য বা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য তাদের সহায়তা করা। পঞ্চম খাত হলো দাসমুক্তি বা অন্যায়ভাবে আটক বন্দীদের মুক্তির জন্য ব্যয় করা। ষষ্ঠ খাত হলো ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, যারা বৈধ কারণে ঋণের জালে আবদ্ধ এবং তা পরিশোধে অক্ষম; তবে পাপ কাজে ঋণ গ্রহণকারী তওবা না করা পর্যন্ত এই সাহায্য পাবে না। সপ্তম খাত হলো ‍‍`ফি সাবিলিল্লাহ‍‍` বা আল্লাহর পথে ব্যয়, যা দ্বারা মূলত জিহাদরত মুজাহিদদের বোঝানো হয়, তবে আধুনিক অনেক আলেম এর ব্যাপক অর্থ গ্রহণ করে দ্বীনি ইলম অর্জন ও প্রচারের কাজকেও এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অষ্টম খাত হলো মুসাফির, যারা সফরে এসে অর্থ সংকটে পড়েছেন, যদিও নিজ বাড়িতে তারা সম্পদশালী হতে পারেন।

ইসলামী শরীয়ত যাকাত দেওয়ার ক্ষেত্রে যেমন খাত নির্ধারণ করে দিয়েছে, তেমনি কাদেরকে যাকাত দেওয়া যাবে না সে বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। নিজের সরাসরি রক্ত সম্পর্কীয় উর্ধ্বতন আত্মীয় যেমন পিতা-মাতা, দাদা-দাদী এবং অধস্তন আত্মীয় যেমন ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনিকে যাকাত দেওয়া যাবে না, কারণ তাদের ভরণপোষণ করা ব্যক্তির নৈতিক দায়িত্ব। একইভাবে স্বামী স্ত্রীকে বা স্ত্রী স্বামীকে যাকাত দিতে পারবে না। কোনো ধনী ব্যক্তি বা যার নেসাব পরিমাণ সম্পদ আছে, তাকে যাকাত দেওয়া হারাম। এছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানিতা বংশধর বা বনী হাশিম গোত্রের সদস্যদের জন্য যাকাত গ্রহণ করা নিষিদ্ধ। অমুসলিমদেরকেও যাকাতের অর্থ দেওয়া যাবে না, তবে তাদের সাধারণ দান বা সাদাকাহ করা যাবে। যাকাত একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়ার হাতিয়ার। এটি সমাজের বিত্তবানদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয় এবং দরিদ্রদের প্রতি মমত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিকভাবে যাকাত হিসাব করে প্রকৃত হকদারদের কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার তাওফিক দান করুন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

ফিকহ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!