শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৭ ফাল্গুন ১৪৩২

নারীর সম্ভ্রম ও চরিত্র রক্ষা: ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের শাশ্বত শিক্ষা

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬, ০২:২০ পিএম
নারীর সম্ভ্রম ও চরিত্র রক্ষা: ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের শাশ্বত শিক্ষা

পবিত্রতা ও নৈতিকতার জয় / Ai

মানুষের জীবনের গতিপথে যৌবনকাল হলো এমন এক সন্ধিক্ষণ যেখানে আবেগ এবং বিবেকের মধ্যে নিরন্তর এক লড়াই চলতে থাকে। বিশেষ করে বর্তমান যুগে যেখানে প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ এবং অপসংস্কৃতির হাতছানি তরুণ প্রজন্মের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে সেখানে সতীত্ব ও নৈতিকতা রক্ষা করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বারো কিংবা চৌদ্দ বছর বয়সের একটি কিশোর বা কিশোরীর কাছে জীবনের বসন্ত কেবল শুরু হয় কিন্তু এই বয়সেই যদি তারা আবেগের বশবর্তী হয়ে নিজেকে হারামের পথে বিলিয়ে দেয় তবে তার পরিণাম হয় অত্যন্ত ভয়াবহ। আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া হাজারো পারিবারিক ট্র্যাজেডির দিকে তাকালে দেখা যায় যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবৈধ সম্পর্কের কারণেই দীর্ঘদিনের সাজানো সুখের সংসারগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। বড় বোন বা পরিবারের অন্য সদস্যদের ভুল থেকে শিক্ষা না নিয়ে একই গর্তে পা দেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। সামাজিক অবক্ষয়ের এই করাল গ্রাস থেকে বাঁচতে হলে আমাদের প্রথমে মানুষের মর্যাদা এবং স্রষ্টার পক্ষ থেকে নির্ধারিত সীমারেখা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে হবে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানবজাতিকে আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং বনী আদমকে বিশেষ সম্মান দান করেছেন (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৭০)। এই সম্মানের দাবি হলো মানুষ নিজেকে সস্তা পণ্যের মতো অন্যের সামনে উপস্থাপন করবে না বরং নিজের মর্যাদা বজায় রেখে চলবে।

ইসলামি সমাজ ব্যবস্থায় নারীর মর্যাদাকে অত্যন্ত উঁচুতে রাখা হয়েছে। একজন নারীকে সমাজের মাথার সাথে তুলনা করা হয়েছে আর পুরুষকে কানের সাথে। মাথার গুরুত্ব যেমন কানের চেয়ে অনেক বেশি তেমনি নারীর সম্মান ও পবিত্রতা রক্ষার ওপর পুরো সমাজের স্থায়িত্ব নির্ভর করে। আল্লাহ তাআলা নারীর সম্ভ্রম ও লজ্জাস্থান হিফাজত করাকে জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করেছেন। অথচ আধুনিকতার নামে আজ মুসলিম নারীরা তাদের সেই রাজকীয় সম্মান ভুলে গিয়ে পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে নিজেদের সস্তা বিনোদনের বস্তুতে পরিণত করছে। একজন মুমিন নারীর মর্যাদা আল্লাহর কাছে এত বেশি যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরো পৃথিবী এবং এর মধ্যস্থিত সবকিছুর চেয়েও একজন নেককার নারীকে শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে অভিহিত করেছেন (সহীহ মুসলিম, ১৪৬৭)। এই আকাশচুম্বী সম্মানকে সামান্য আবেগ বা ক্ষণস্থায়ী মোহের বশবর্তী হয়ে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া কেবল নিজের ক্ষতি নয় বরং এটি পুরো পরিবারের সম্মানকে জাহান্নামের আগুনের মতো জ্বালিয়ে ছাই করে দেওয়ার শামিল। একইভাবে যুবকদেরও দায়িত্ব রয়েছে অন্যের বোনের দিকে লোলুপ দৃষ্টি না দিয়ে নিজের বোনের সম্ভ্রমের কথা চিন্তা করা। কারো ইজ্জত নষ্ট করা এমন এক অপূরণীয় ক্ষতি যা কোনো পার্থিব সম্পদ বা ক্ষতিপূরণ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। ইসলামে জিনা বা ব্যভিচারকে কেবল একটি পাপ হিসেবে দেখা হয় না বরং একে অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং এর ধারের কাছে যাওয়াও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৩২)।

আল্লাহ তাআলা কেবল জিনা করতে নিষেধ করেননি বরং জিনার দিকে নিয়ে যায় এমন প্রতিটি কাজ যেমন কুদৃষ্টি, অবৈধ স্পর্শ বা নির্জনে পরনারীর সাথে সাক্ষাৎকেও হারাম করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরনারীকে স্পর্শ করার ভয়াবহতা সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে কারো মাথায় লোহার সুঁই গেঁথে দেওয়া তার জন্য এর চেয়ে উত্তম যে সে এমন কোনো নারীকে স্পর্শ করবে যা তার জন্য হালাল নয় (তাবারানী, মুজামুল কাবীর, ৪৮৬)। বর্তমানের যুবসমাজ প্রায়ই শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে মনে করে যে তারা তাদের নফস বা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে কিন্তু এটি শয়তানের অন্যতম বড় ধোঁকা। মানুষের নফস বা প্রবৃত্তি তাকে সব সময় মন্দের দিকেই ধাবিত করে যদি না আল্লাহ তাকে রক্ষা করেন। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা আমাদের এই সত্যটি স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয়। যখন মিশরের আজিজের স্ত্রী জুলাইখা তাঁকে পাপের দিকে আহ্বান জানিয়েছিল এবং প্রাসাদের দরজাগুলো বন্ধ করে দিয়েছিল তখন ইউসুফ আলাইহিস সালাম আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছিলেন। তিনি এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা থেকে নিজেকে রক্ষা করেছিলেন কিন্তু নবীর মর্যাদা লাভ করার পরেও তিনি অহংকার করেননি। তিনি বিনয়ের সাথে স্বীকার করেছিলেন যে তিনি তাঁর নফসকে নির্দোষ মনে করেন না কারণ মানুষের নফস খারাপ কাজের নির্দেশ দিয়ে থাকে যদি না রবের বিশেষ দয়া থাকে (সূরা ইউসুফ, ১২:৫৩)।

একজন নবী হয়েও ইউসুফ আলাইহিস সালাম যদি নিজের নফসের ওপর পূর্ণ আস্থা না রাখেন তবে আজকের যুগের একজন সাধারণ যুবক বা যুবতী কীভাবে দাবি করতে পারে যে তারা তাদের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। এটি আসলে নিজের সাথে এক প্রকার প্রতারণা মাত্র। প্রকৃত সফলতা ধন-সম্পদ বা ক্যারিয়ার গড়ার মধ্যে নিহিত নয় বরং প্রকৃত সফলতা হলো নিজের নফসকে পবিত্র রাখার মধ্যে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে নফসের শপথ করে বলেছেন যে যে নিজেকে শুদ্ধ করল সেই সফলকাম হলো আর যে নিজেকে কলুষিত করল সে ব্যর্থ হলো (সূরা আশ-শামস, ৯১:৭-১০)। তথাকথিত প্রেমের নামে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে নিজেদের যৌবনকে কলুষিত করা মানে হলো দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ই হারানো। সতীত্ব ও পবিত্রতা একজন নারীর সবচেয়ে বড় অলঙ্কার যা কোনো পুরুষের প্ররোচনায় পড়ে বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়। যে পুরুষ বিয়ের আগে কোনো নারীকে স্পর্শ করতে চায় বা নির্জনে দেখা করতে চায় সে মূলত তাকে ভালোবাসে না বরং সে তাকে ভোগ করতে চায়। প্রকৃত মুমিন যে আল্লাহকে ভয় করে সে কখনো বিয়ের আগে কোনো নারীর দিকে কুদৃষ্টি দেয় না বরং আল্লাহর বিধান মেনে হালাল উপায়ে তাকে পাওয়ার চেষ্টা করে।

হালাল সম্পর্কের মধ্যেই প্রকৃত শান্তি ও কল্যাণ নিহিত আর হারাম পথে রয়েছে কেবল অশান্তি ও ধ্বংস। কিয়ামতের দিন প্রতিটি কর্মের হিসাব দিতে হবে এবং সেদিন মানুষের হাত, পা, চোখ এবং শরীরের চামড়া তার নিজের বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দেবে (সূরা ইয়াসিন, ৩৬:৬৫)। সুতরাং সময় থাকতে তওবা করে আল্লাহর পথে ফিরে আসা জরুরি। যে যুবক বা যুবতী তার যৌবনকালকে আল্লাহর ইবাদতে এবং পবিত্রতার সাথে অতিবাহিত করবে কিয়ামতের সেই ভয়াল দিনে আল্লাহ তাকে তাঁর আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন (সহীহ বুখারী, ৬৬০)। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে সোশ্যাল মিডিয়ায় হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে নিজের এবং পরিবারের সম্মান নষ্ট করা চরম বোকামি। বাবা-মা যে স্বপ্ন ও কষ্ট নিয়ে সন্তানদের বড় করেন সেই স্বপ্নকে সামান্য কামনার আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত অমানবিক কাজ। বিবাহের মাধ্যমে আল্লাহ নারী-পুরুষের সম্পর্ককে পবিত্র করেছেন এবং একে অপরকে প্রশান্তির উৎস বানিয়েছেন (সূরা আর-রূম, ৩০:২১)। তাই ধৈর্য ধরে হালাল সম্পর্কের জন্য অপেক্ষা করাই হলো মুমিনের পরিচয়। শয়তানের ফাঁদ থেকে বাঁচতে সর্বদা আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা এবং ইউসুফ আলাইহিস সালামের মতো চারিত্রিক দৃঢ়তা প্রদর্শন করা আজ সময়ের দাবি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে নফসের ধোঁকা থেকে এবং জিনার মতো জঘন্য পাপ থেকে রক্ষা করুন এবং যুবসমাজকে পবিত্র জীবন গড়ার শক্তি দিন। আমীন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

কোরআন বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!