শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৭ ফাল্গুন ১৪৩২

পাপের চক্র ও তওবার অলৌকিক শক্তি: আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার পথ

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬, ০২:২৭ পিএম
পাপের চক্র ও তওবার অলৌকিক শক্তি: আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার পথ

তওবার নূরে পাপের বিনাশ / Ai

মানুষ হিসেবে আমাদের অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো শয়তানের প্রলোভন ও প্রবৃত্তির তাড়না যার মধ্য দিয়ে আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত অতিবাহিত হয়। দুনিয়ার বুকে আমরা কেউই শয়তানের মায়াজাল থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়ে বাঁচতে পারব না কারণ নিষিদ্ধ বস্তুর হাতছানি সবসময় আমাদের ইন্দ্রিয়কে উত্তেজিত করে রাখে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের স্বরূপ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন যে শয়তান মানুষকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং তাকে অশ্লীল কাজের দিকে ধাবিত করার নির্দেশ দেয় (সূরা আল-বাকারা, ২:২৬৮)। যখনই একজন মুমিন নিজেকে পরিশুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় তখনই শয়তান তার কানে ফিসফিস করে বলতে শুরু করে যে সে জীবনের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই যে হারামের বিজ্ঞাপন যা আমাদের চারপাশে সুশোভিতভাবে উপস্থাপন করা হয় তা মূলত এক প্রকার মরীচিকা। শয়তান মানুষের প্রতিটি কাজকে তার নিজের কাছে সুন্দর ও যৌক্তিক করে তোলে যাতে সে অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পেয়ে পাপে লিপ্ত হতে পারে (সূরা আল-আনআম, ৬:৪৩)। মানুষ যখন কোনো গুনাহের দিকে পা বাড়ায় তখন সে নিজেকে মিথ্যে সান্ত্বনা দেয় যে এটিই শেষবার এবং এর মাধ্যমেই সে চরম তৃপ্তি লাভ করবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি এক অন্তহীন চক্রের সূচনা মাত্র যা বান্দাকে আল্লাহর রহমত থেকে যোজন যোজন দূরে সরিয়ে দেয়।

পাপের এই চক্রটি অত্যন্ত কৌশলী যেখানে প্রথম ধাপ হলো পাপে লিপ্ত হওয়া এবং দ্বিতীয় ধাপ হলো সেই পাপের গ্লানি থেকে বাঁচতে পুনরায় অবান্তর যুক্তির আশ্রয় নেওয়া। শয়তান চায় মানুষ যেন তার নিজের বিবেককে ধোঁকা দেয় এবং মনে করে যে তার পাপগুলো খুব একটা গুরুতর নয়। এর সাথে যখন কুসঙ্গী বা বন্ধু-বান্ধবের প্ররোচনা যুক্ত হয় তখন মানুষের তাকওয়া বা খোদাভীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেকেই ভাবতে শুরু করেন যে জীবনের আনন্দ কেবল নিষিদ্ধ বস্তুতেই নিহিত অথচ পাপ সম্পন্ন হওয়ার পরেই নেমে আসে এক তীব্র অন্ধকার ও গুমোট অনুশোচনা। এই অনুশোচনা যখন মানুষকে আল্লাহর দিকে ফেরানোর পরিবর্তে হতাশার দিকে নিয়ে যায় তখনই শয়তানের চূড়ান্ত বিজয় ঘটে। কিন্তু মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো সে ভুল করতে পারে কিন্তু সে ভুলের ওপর কখনো অটল থাকে না। সূরা আলে ইমরানে আল্লাহ পরিষ্কার করেছেন যে মুমিনরা যখন কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেলে বা নিজেদের ওপর জুলুম করে তখন তারা সাথে সাথে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩৫)। পাপের চক্র ভাঙার জন্য প্রথম প্রয়োজন হলো এই আত্মোপলব্ধি যে আমি শয়তানের ক্রীড়নক হয়ে থাকতে চাই না।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রতিটি অভ্যন্তরীণ লড়াই সম্পর্কে সম্যক অবগত। তিনি জানেন যে শয়তানের বিছানো এই রঙিন ফাঁদগুলো কতটা শক্তিশালী এবং মানুষের জন্য সেই আকর্ষণ উপেক্ষা করা কতটা কঠিন। তবে যাদের জন্য পাপের সুযোগ খুব সহজ কিন্তু কেবল আল্লাহর ভয়ে তারা তা বর্জন করে তাদের মর্যাদা আল্লাহর কাছে আকাশচুম্বী। এটিই হলো প্রকৃত তাকওয়া যা একজন সাধারণ মানুষকে ‍‍`ইবাদুর রহমান‍‍` বা দয়াময় আল্লাহর বিশেষ বান্দাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। দুনিয়ার এই সাময়িক ইন্দ্রিয়সুখ আসলে এক প্রকার ভুল ভালোবাসা বা মোহ যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে। যুবসমাজের মাঝে বিশেষ করে হারাম সম্পর্কের যে মহামারি আমরা লক্ষ্য করি সেখানে আবেগীয় কারসাজি বা ইমোশনাল ম্যানিপুলেশনকে শয়তান বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। যখন কোনো যুবক বা যুবতী এই সম্পর্কের বেড়াজাল ছিঁড়ে আল্লাহর পথে ফিরতে চায় তখন তাকে নানাভাবে আবেগতাড়িত করে পুনরায় পাপের পথে টানার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ঈমানের দাবি হলো এই যে আল্লাহর অসন্তুষ্টির পথে কোনো সম্পর্ক বা আবেগ টিকে থাকতে পারে না। এই নীরব সংগ্রাম এবং হৃদয়ের রক্তক্ষরণ কেবল আল্লাহই দেখেন এবং তিনি এর বিনিময়ে বান্দাকে এমন এক শাশ্বত প্রশান্তি দান করেন যা কোটি টাকা ব্যয় করেও কেনা সম্ভব নয়।

আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-ফুরকানে তাঁর প্রিয় বান্দাদের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে তিনটি বড় পাপ থেকে বেঁচে থাকার কথা বলেছেন যা হলো শিরক, হত্যা এবং জিনা বা ব্যভিচার (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৬৮)। বর্তমান আধুনিক জাহেলিয়াতের যুগে এই তিনটি পাপই ভিন্ন ভিন্ন মোড়কে আমাদের সমাজে জেঁকে বসেছে। শিরক এখন আধুনিক চিন্তাধারার আড়ালে লুকিয়ে থাকে আর ব্যভিচারকে ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে সামাজিক বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলে। আল্লাহ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে যারা এই কাজগুলোতে লিপ্ত হবে কিয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে এবং তারা সেখানে লাঞ্ছিত অবস্থায় চিরকাল থাকবে। এই কঠোর বাণীর পর যে কোনো মানুষের মনে এক প্রচণ্ড ভীতি সঞ্চার হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আল্লাহ তাঁর অসীম দয়ার ভাণ্ডার খুলে দিয়েছেন পরবর্তী আয়াতেই যেখানে তিনি বলেছেন যে যারা তওবা করবে, ঈমান আনবে এবং নেক আমল করবে আল্লাহ তাদের পেছনের সমস্ত পাপকে নেকি দিয়ে বদলে দেবেন (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৭০)। এটি ইসলামের এক অলৌকিক ও বিস্ময়কর সুসংবাদ।

তওবার মাধ্যমে পাপকে পুণ্য দিয়ে বদলে দেওয়ার এই ঘোষণা প্রমাণ করে যে আল্লাহ মানুষের ধ্বংস চান না বরং তিনি চান বান্দা তাঁর দিকে ফিরে আসুক। যখন একজন মানুষ অতীতে করা জঘন্য অপরাধের জন্য লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে লুটিয়ে পড়ে তখন তার সেই অনুশোচনা আল্লাহর কাছে এতই প্রিয় হয় যে তিনি তার আমলনামার পুরো সমীকরণ বদলে দেন। তওবা করার পর যখনই সেই বান্দার পুরনো পাপের কথা মনে পড়ে এবং সে লজ্জিত হয়ে ‍‍`আস্তাগফিরুল্লাহ‍‍` পড়ে তখন শয়তানের চক্রান্ত তার নিজের বিরুদ্ধেই বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে। শয়তান মানুষকে নিরাশ করতে চায় কিন্তু আল্লাহ আমাদের বারবার আশার আলো দেখান। তাই পাপের ভার যত বড়ই হোক না কেন আল্লাহর রহমতের সমুদ্রের কাছে তা নগণ্য। যদি আজই কেউ তওবাতুন নাসুহা বা খাঁটি তওবা করতে পারে তবে তার অন্ধকার অতীত এক আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতে রূপান্তরিত হওয়া সম্ভব। জীবনের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস আল্লাহর দান এবং এই সময়টি অপচয় না করে তাঁর দিকে ফিরে আসাই হলো বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের চরম সার্থকতা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে শয়তানের ফাঁদ ছিন্ন করে তাঁর প্রিয় বান্দা হওয়ার তৌফিক দান করুন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

সংবাদ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!