মানুষের জীবন প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তা এবং নানাবিধ সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে শুরু করে শারীরিক অসুস্থতা পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে আমরা নিরাপত্তার অন্বেষণ করি। তবে অধিকাংশ মানুষ কেবল জাগতিক উপায়ের ওপর নির্ভর করে থাকে যা সবসময় কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনে না। অথচ ইসলামের সুমহান শিক্ষা আমাদের এমন এক শক্তিশালী হাতিয়ারের কথা জানায় যা কেবল আমাদের সম্পদকেই পবিত্র করে না বরং জীবনের সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে আমাদের সুরক্ষাও নিশ্চিত করে। এই বিশেষ মাধ্যমটি হলো সাদাকাহ বা দান। আমরা যখন আমাদের উপার্জিত অর্থ থেকে সামান্য কিছু টাকা দান করি তখন বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে আমাদের মূলধন কমে গেল। গণিতের সাধারণ হিসাবে দশ থেকে এক বিয়োগ করলে নয় থাকে কিন্তু ঈমানের আধ্যাত্মিক হিসাবে এই বিয়োগফল আসলে এক অভাবনীয় বৃদ্ধির সূচনা করে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর পবিত্র কালামে এই দানকে একটি উত্তম ঋণ বা করজে হাসানা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি ওয়াদা করেছেন যে এই ঋণ তিনি কয়েক গুণ বাড়িয়ে ফেরত দেবেন এবং এটিই হলো মুমিনের জীবনের শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ।
সাদাকাহর আধ্যাত্মিক শক্তি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ বাণী প্রদান করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে সাদাকাহ গুনাহকে সেভাবে নিভিয়ে দেয় যেভাবে পানি আগুনকে নিভিয়ে ফেলে (সুনানে তিরমিযী, ২৬১৬)। আমাদের জীবনে যে সমস্ত বালা-মুসিবত বা আকস্মিক বিপদ আসে তার একটি বড় কারণ হলো আমাদের ব্যক্তিগত গুনাহ বা অবাধ্যতা। যখন আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করি তখন সেই দান আমাদের পাপসমূহকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দেয়। ফলে পাপের কারণে আসার কথা ছিল এমন অনেক বড় বড় বিপদ আল্লাহর রহমতে আমাদের জীবন থেকে অপসারিত হয়। এটি কোনো কাল্পনিক ধারণা নয় বরং এটি এক অমোঘ ঐশী নীতি যা যুগে যুগে প্রমাণিত। অনেক সময় আমরা কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ি এবং আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ সেবা নিয়েও আরোগ্য লাভ করি না। এমন পরিস্থিতিতে ইসলাম আমাদের সাদাকাহর মাধ্যমে আরোগ্য অন্বেষণ করার পরামর্শ দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে বলেছেন যে তোমরা তোমাদের রোগীদের সাদাকাহর মাধ্যমে চিকিৎসা করো (সুনানে আবি দাউদ)। এটি প্রমাণ করে যে ওষুধের পাশাপাশি আল্লাহর পক্ষ থেকে শেফা বা আরোগ্য লাভের জন্য দান করা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও পরীক্ষিত উসিলা।
বর্তমান বিশ্বের পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় আমরা কেবল মুনাফা এবং দৃশ্যমান সঞ্চয়কে গুরুত্ব দেই। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে রিযিকের সমৃদ্ধি কেবল সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। রিযিকের বরকত হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এমন এক অদৃশ্য কল্যাণ যা অল্প সম্পদকেও মানুষের যাবতীয় প্রয়োজনের জন্য যথেষ্ট করে দেয়। আল্লাহ তায়ালা সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং সাদাকাহকে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করেন (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৬)। এখানে বৃদ্ধি বলতে কেবল টাকার অংক বৃদ্ধি পাওয়া নয় বরং সেই টাকা দিয়ে আত্মিক প্রশান্তি কেনা এবং অহেতুক ব্যয় থেকে মুক্তি পাওয়াকেও বোঝায়। একজন ব্যক্তি কোটি টাকা আয় করেও হয়তো পারিবারিক অশান্তি বা জটিল রোগের কারণে শান্তি পায় না আবার একজন স্বল্প আয়ের মানুষ তার পরিবারের সাথে পরম সুখে দিন অতিবাহিত করে। এই যে মানসিক স্থিরতা এবং অল্পে তুষ্টি এটিই হলো সাদাকাহর মাধ্যমে প্রাপ্ত প্রকৃত বরকত। কৃষকের বীজের রূপকটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কৃষক যদি তার বীজ আলমারিতে জমিয়ে রাখে তবে কোনোদিন ফসল পাওয়া যাবে না ঠিক তেমনি সম্পদ কেবল কুক্ষিগত করে রাখলে তাতে কোনো সুফল আসে না বরং দান করলে তা বহুগুণ হয়ে ফিরে আসে।
সাদাকাহর ক্ষেত্রে দানের পরিমাণের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ইখলাস বা আন্তরিকতার ওপর। শয়তান মানুষকে সবসময় দারিদ্র্যের ভয় দেখায় যাতে সে কল্যাণের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে কৃপণতায় লিপ্ত হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিখিয়েছেন যে আল্লাহর কাছে সেই আমলটিই সবচেয়ে বেশি প্রিয় যা নিয়মিত করা হয় যদিও তা পরিমাণে সামান্য হয় (সহীহ বুখারী, ৬৪৬৫)। প্রতিদিন যদি কেউ তার সামর্থ্য অনুযায়ী মাত্র এক টাকাও আল্লাহর নামে দান করার অভ্যাস করে তবে সেই ধারাবাহিকতা তার ঈমানকে মজবুত রাখে এবং শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষা করে। সাদাকাহ কেবল অর্থ প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি ভালো কথা বলা বা অন্য কোনো মানুষের মুখে হাসি ফোটানোকেও ইসলামে সাদাকাহ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে (সহীহ মুসলিম)। এর মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয় যে দান করার জন্য ধনী হওয়ার প্রয়োজন নেই বরং একটি দয়ালু হৃদয় থাকাই যথেষ্ট। সামাজিক সহমর্মিতা এবং ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধির জন্য এই ছোট ছোট দানের ভূমিকা অপরিসীম।
মানুষের জীবনের চূড়ান্ত ও অবধারিত সত্য হলো মৃত্যু। মৃত্যুর সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে মানুষ যখন তার জীবনের সমস্ত অর্জনের অসারতা প্রত্যক্ষ করবে তখন সে নতুন করে বাঁচার আকুতি জানাবে না। বরং তার সেই মুহূর্তের একমাত্র কামনা হবে দান করার সুযোগ পাওয়া। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সেই করুণ দৃশ্যের বর্ণনা দিয়ে বলেছেন যে যখন কারো নিকট মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন সে বলে হে আমার রব আমাকে আর সামান্য একটু সময় দাও যাতে আমি সাদাকাহ দিতে পারি এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি (সূরা আল-মুনাফিকুন, ৬৩:১০)। মৃত্যু পথযাত্রী ব্যক্তির এই ব্যাকুল আর্তি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে আখেরাতের কঠিন সফরে সাদাকাহর চেয়ে মূল্যবান কোনো পাথেয় নেই। আমরা আজ যে সম্পদ প্রবল মায়ার সাথে আগলে ধরে আছি তা একদিন উত্তরাধিকারীদের মালিকানায় চলে যাবে কিন্তু যেটুকু আমরা আল্লাহর রাস্তায় দান করছি কেবল সেটুকুই আমাদের সাথে কবরে যাবে এবং হাশরের ময়দানে আমাদের মাথার ওপর ছায়া হয়ে থাকবে।
সাদাকাহ কেবল অভাবীদের প্রতি দয়া প্রদর্শন নয় বরং এটি নিজের আত্মাকে কৃপণতা, লোভ এবং অহংকারের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার একটি আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া। এটি বিপদ-আপদ থেকে বাঁচার একটি দুর্ভেদ্য ঢাল যা মুমিনকে খারাপ মৃত্যু থেকেও সুরক্ষা দেয়। আমরা যখন অন্যের প্রয়োজনে নিজের প্রিয় বস্তু ত্যাগ করি তখন স্বয়ং বিশ্বজাহানের মালিক আমাদের প্রয়োজনে সাহায্য করেন। বিপদ থেকে সুরক্ষা এবং রিযিকের প্রশস্ততা অর্জনের জন্য সাদাকাহর চেয়ে নিরাপদ ও লাভজনক কোনো বিনিয়োগ আর হতে পারে না। আমাদের উচিত আমাদের দৈনন্দিন জীবনের রুটিনে সাদাকাহকে একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। আজ থেকেই আপনার উপার্জনের একটি নির্দিষ্ট অংশ আল্লাহর জন্য আলাদা করে রাখুন। এই সামান্য ত্যাগই হয়তো আপনার জীবনের কোনো এক বড় দুর্ঘটনা রোধ করবে বা আপনাকে কঠিন ব্যাধি থেকে মুক্তি দেবে। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে কৃপণতা থেকে হেফাজত করুন এবং নিয়মিত সাদাকাহর মাধ্যমে তাঁর প্রিয় বান্দা হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।

আপনার মতামত লিখুন :