শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৮ ফাল্গুন ১৪৩২

সূরা আসর ও সময়ের গুরুত্ব: মহাক্ষতি থেকে বাঁচার ৪টি শর্ত

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬, ০৩:৩১ পিএম
সূরা আসর ও সময়ের গুরুত্ব: মহাক্ষতি থেকে বাঁচার ৪টি শর্ত

সময়ের শপথ ও সফলতার পথ / Ai

মানুষের জীবন মূলত কতগুলো সময়ের সমষ্টি মাত্র যা প্রতি মুহূর্তে আমাদের হাত থেকে বালুর মতো ঝরে যাচ্ছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের প্রত্যেককে প্রতিদিন চব্বিশটি করে ঘণ্টা উপহার দিয়েছেন কিন্তু আমরা যদি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি তবে দেখব যে আমাদের এই অমূল্য সময়ের সিংহভাগই ব্যয় হচ্ছে ঘুম, জাগতিক জীবিকা অন্বেষণ এবং নানাবিধ বৈষয়িক ঝামেলায়। আখেরাতের বিল পরিশোধ বা মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতির জন্য আমাদের হাতে অবশিষ্ট সময়ের পরিমাণ খুবই নগণ্য। অথচ কেয়ামতের সেই ভয়াবহ দিনে পাঁচটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর না দেওয়া পর্যন্ত কোনো আদম সন্তান তার পা এক কদমও নড়াতে পারবে না। সেই প্রশ্নগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মানুষ তার এই সংক্ষিপ্ত জীবন বা সময় কোন পথে অতিবাহিত করেছে (জামে তিরমিজি, ২৪১৬)। পবিত্র কুরআনের ১০৩ নম্বর সূরা সূরা আল-আসরে আল্লাহ তায়ালা সময়ের কসম খেয়ে মানবজাতিকে এক চরম সত্যের মুখোমুখি করেছেন। আরবি ব্যাকরণ ও তাফসির শাস্ত্রের আলোকে আসর বলতে এমন এক সময়কে বোঝানো হয় যা অত্যন্ত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে ঠিক যেমন পড়ন্ত বিকেলের সূর্য ডুবে যাওয়ার আগের মুহূর্ত। আল্লাহ যখন কোনো কিছুর শপথ করেন তখন সেই বিষয়ের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য অপরিসীম হয়ে দাঁড়ায় যা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের উদাসীনতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

ইমাম আশ-শাফিঈ রহমতুল্লাহি আলাইহি যথার্থই বলেছিলেন যে মানুষ যদি কেবল এই একটি সূরা নিয়ে যথাযথভাবে চিন্তা করত তবে তাদের হেদায়েতের জন্য এটিই যথেষ্ট হতো। আল্লাহ তায়ালা এই সূরায় ঘোষণা করেছেন যে নিশ্চয়ই সমস্ত মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। এখানে খুসর বা ক্ষতি শব্দটি কোনো সাধারণ লোকসানকে বোঝায় না বরং এটি এমন এক দেউলিয়া অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে যেখানে একজন মানুষ তার মূলধনসহ সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। আমাদের জীবনের একমাত্র মূলধন হলো আমাদের হায়াত বা বরাদ্দকৃত সময়। একজন বরফ বিক্রেতার পুঁজি যেমন সময়ের সাথে সাথে গলে শেষ হয়ে যায় ঠিক তেমনি আমাদের আয়ুষ্কাল প্রতি সেকেন্ডে ফুরিয়ে যাচ্ছে। যদি আমরা এই সময়ের সঠিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে না পারি তবে পরকালে আমাদের জন্য চরম ব্যর্থতা অপেক্ষা করছে। এই অনিবার্য ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ তায়ালা চারটি অপরিহার্য শর্ত জুড়ে দিয়েছেন যা হলো ঈমান, নেক আমল, হকের উপদেশ এবং ধৈর্যের উপদেশ। কিন্তু আধুনিক যুগে আমাদের ট্র্যাজেডি হলো আমরা ইসলামকে কেবল আমাদের সুবিধামতো খণ্ডিতভাবে গ্রহণ করি যা আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্যকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

দুনিয়াতে আমরা যখন কোনো চাকরি করি তখন বসের দেওয়া প্রতিটি নির্দেশনা পালনে আমরা অত্যন্ত সতর্ক থাকি। যদি কোনো বস তার কর্মচারীকে চারটি কাজ সম্পাদন করতে বলেন এবং কর্মচারী তার পছন্দমতো দুটি কাজ করে বাকি দুটি অবহেলা করে তবে সেই কর্মচারীর চাকরি থাকা অসম্ভব। আমরা দুনিয়ার নিয়ম-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে এতটাই সচেতন যে কোনো ইমিগ্রেশন অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা ভিসার ইন্টারভিউ থাকলে ভোরবেলা উপস্থিত হওয়ার জন্য আগের রাত থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করি। সেখানে সামান্য বিলম্ব করার কথা আমরা চিন্তাও করতে পারি না কারণ আমরা জানি যে সুযোগ হাতছাড়া হলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে। অথচ মহাবিশ্বের মালিক যখন প্রতিদিন পাঁচবার আমাদের তাঁর দরবারে উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানান তখন আমাদের মধ্যে সেই তাড়াহুড়ো বা সচেতনতা দেখা যায় না। আমরা কি সত্যিই বিশ্বাস করি যে আখেরাতের ক্ষতি দুনিয়ার যেকোনো ক্ষতির চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি ভয়াবহ? সূরা আসরের শিক্ষা আমাদের শেখায় যে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আখেরাতের পাথেয় হিসেবে বিনিয়োগ করতে হবে কারণ ঈমান কেবল মৌখিক স্বীকৃতির নাম নয় বরং এর সাথে আমিলুস সালিহাত বা সুন্নাহ সমর্থিত সৎকর্মের উপস্থিতি আবশ্যক।

সফলতার তৃতীয় শর্ত হলো তাওয়াসাও বিল হক বা একে অপরকে সত্যের উপদেশ দেওয়া। এটি মূলত সামাজিক সংস্কার ও দাওয়াতের কাজ। ইসলামের শিক্ষা হলো কেবল নিজে ভালো থাকলেই চলবে না বরং সমাজকে অন্যায়ের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করতে হবে। আপনি নিজে নামাজ পড়লেন কিন্তু আপনার প্রতিবেশী বা আপনজনরা অন্যায়ে ডুবে থাকল এবং আপনি তাদের সতর্ক করলেন না তবে সূরা আসরের মানদণ্ড অনুযায়ী আপনি পূর্ণাঙ্গ সফল হতে পারবেন না। সর্বশেষ শর্তটি হলো তাওয়াসাও বিস সবর বা ধৈর্যের উপদেশ দেওয়া। সত্যের পথে চলতে গেলে নানাবিধ বাধা ও প্রতিকূলতা আসবেই আর সেই সময়ে নিজে ধৈর্য ধারণ করা এবং অন্যকেও ধৈর্যের পথে আহ্বান করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আমাদের বর্তমান মানসিকতা এমন হয়ে গেছে যে আমরা মনে করি ইবাদত কেবল ব্যক্তিগত বিষয় এবং দাওয়াত বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করা কেবল আলেমদের দায়িত্ব। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে এই চারটি গুণের কোনো একটি বাদ পড়লে মানুষ ক্ষতির আবর্তেই রয়ে যাবে। হাশরের ময়দানে কোনো অজুহাতই ধোপে টিকবে না কারণ এই দ্বীন কোনো বুফে ডিনার নয় যে আপনি আপনার পছন্দের অংশটুকু নেবেন আর বাকিটা ত্যাগ করবেন।

ইসলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ করার নির্দেশ এসেছে পবিত্র কুরআনে (সূরা আল-বাকারা, ২:২০৮)। আমাদের বুঝতে হবে যে আমাদের প্রাত্যহিক রুটিনে পরিবর্তন না আনলে আমাদের জীবনের চূড়ান্ত ফলাফলে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে না। একজন ছাত্র যেমন পরীক্ষার আগের রাতে সময়ের মূল্য বুঝতে পেরে নিমগ্ন হয়ে পড়াশোনা করে ঠিক তেমনি আমাদের হায়াতের সূর্যও যেকোনো সময় ডুবে যেতে পারে। মৃত্যু আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে না বরং আমরাই মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঁচটি মহামূল্যবান নেয়ামত আসার আগে পাঁচটি জিনিসের সদ্ব্যবহার করতে বলেছেন যার মধ্যে বার্ধক্যের আগে যৌবন এবং মৃত্যুর আগে জীবন অন্যতম (মুসতাদরাক আল-হাকিম, ৭৮৪৬)। আজকের এই আলোচনা থেকে আমাদের পরম শিক্ষা হলো আমাদের জীবনের পরিকল্পনা এমনভাবে সাজানো যেখানে ঈমান, আমল, দাওয়াহ এবং সবরের সুসমন্বয় থাকে। শয়তান আমাদের বোঝাতে চায় যে এখনো অনেক সময় আছে কিন্তু এটি এক মস্ত বড় ধোঁকা। শুধু বিশেষ দিনগুলোতে নয় বরং বছরের প্রতিটি দিন আমাদের এই চারটি গুণের চর্চা করতে হবে। দুনিয়ার সামান্য ইন্টারভিউয়ের প্রস্তুতির চেয়ে রবের সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি অনেক বেশি নিখুঁত হওয়া প্রয়োজন। আসুন আমরা সূরা আসরের আয়নায় নিজেদের জীবনকে বিচার করি এবং আজ থেকেই সময়কে আল্লাহর পথে বিনিয়োগ করি।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

কোরআন বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!