শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৮ ফাল্গুন ১৪৩২

সবই আপনার হুকুম: আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পথ

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬, ০৩:৩৬ পিএম
সবই আপনার হুকুম: আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পথ

আল্লাহর ইচ্ছায় সমর্পণ / Ai

মানুষের অস্তিত্বের প্রতিটি স্পন্দন এবং মহাবিশ্বের প্রতিটি কণার আবর্তন মূলত এক পরম সত্তার ইশারায় পরিচালিত হচ্ছে যাকে আমরা আল-ক্বাদীর বা সর্বশক্তিমান হিসেবে জানি। আমাদের যাপিত জীবনে আমরা প্রতিনিয়ত সাফল্যের পেছনে ছুটি এবং ব্যর্থতাকে ভয় পাই কিন্তু আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টার বাইরেও একটি চূড়ান্ত ফয়সালা রয়েছে। এই ফয়সালাটিই হলো মহান আল্লাহর হুকুম যা ছাড়া গাছের একটি সামান্য পাতাও নড়তে পারে না। জীবনের কঠিন পরীক্ষায় যখন আমরা কোনো প্রিয় বস্তু হারাই কিংবা কোনো বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হই তখন আমাদের মন হতাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। আমরা ভাবতে শুরু করি যে হয়তো আমাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল অথবা ভাগ্য আমাদের সাথে নেই। অথচ একজন প্রকৃত মুমিনের জন্য সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা এবং আশ্রয়ের জায়গা হলো এই বিশ্বাস যে আমার কিছুই করার ছিল না এবং যা কিছু ঘটেছে তা সবই আপনার হুকুম। এই গভীর উপলব্ধি মানুষের অন্তরের সমস্ত অস্থিরতা দূর করে তাকে এক অপার্থিব প্রশান্তি দান করে যা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের যেকোনো থেরাপির চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে তাঁর সার্বভৌম ক্ষমতা সম্পর্কে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে তিনি যা করেন সে সম্পর্কে তাঁকে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না বরং সৃষ্টিজগতকেই তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:২৩)। এই আয়াতের গূঢ় রহস্য আমাদের শেখায় যে আল্লাহর প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে এক অসীম প্রজ্ঞা বা হেকমত লুকিয়ে থাকে যা আমরা অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে উপলব্ধি করতে পারি না। আমাদের জীবনে যখন কোনো ঘটনা আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঘটে তখন আমরা বিচলিত হয়ে পড়ি অথচ সেই ঘটনার মাধ্যমেই হয়তো আল্লাহ আমাদের জন্য কোনো বড় কল্যাণ নির্ধারণ করে রেখেছেন। এই সত্যের ওপর ইমান এবং সন্তুষ্টি অর্জন করাই হলো প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। যখন কোনো বান্দা হাসিমুখে আল্লাহর ফয়সালাকে বরণ করে নেয় তখন তার মর্যাদা আল্লাহর কাছে বহুগুণ বেড়ে যায়। এই আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আমরা আমাদের দুর্বলতা এবং আল্লাহর মহত্ত্বের মাঝে একটি আধ্যাত্মিক সেতু নির্মাণ করি যা আমাদের সমস্ত ব্যর্থতার পরেও কৃতজ্ঞ থাকতে শেখায়।

আত্মিক আরোগ্য লাভের জন্য জিকির বা মহান রবের নিরবচ্ছিন্ন স্মরণ একটি অত্যন্ত কার্যকর মাধ্যম। যখন মানুষের আত্মা পাপের কলুষতায় বা দুনিয়াবি চিন্তায় ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা’ বা ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো আশ্রয় নেই’ এই মন্ত্রটি হৃদয়ে সঞ্জীবনী সুধা হিসেবে কাজ করে। আমরা যখন আমাদের জীবনের সমস্ত ভার আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেই এবং মনে মনে বলি যে সবই আপনার হুকুম তখন আমাদের নফসের অহংকার চূর্ণ হয়ে যায়। এই জিকির কেবল মুখ দিয়ে উচ্চারিত শব্দ নয় বরং এটি একটি গভীর হৃদস্পন্দন যা প্রমাণ করে যে আমরা আমাদের মালিকের প্রতি কতটা বিশ্বস্ত। প্রতিটি নিশ্বাস যখন আল্লাহর জিকিরের সাথে বের হয় তখন মানুষের জীবন সার্থক হয়ে ওঠে এবং তা পরকালের কঠিন সফরের জন্য শ্রেষ্ঠ পাথেয় হিসেবে জমা হয়। আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভ করার প্রধান শর্তই হলো তাঁর ফয়সালার ওপর পূর্ণ সন্তুষ্টি প্রকাশ করা কারণ হুকুম মেনে না নেওয়া মূলত এক ধরনের সূক্ষ্ম অহংকার যা মানুষকে হিদায়াতের পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

সিজদাই হলো সেই শ্রেষ্ঠ মাধ্যম যার দ্বারা বান্দা তার রবের সিদ্ধান্তের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটায়। সিজদারত অবস্থায় মানুষ যখন তার কপালকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় তখন সে মূলত তার আমিত্বকে বিসর্জন দেয়। আমাদের জীবনের প্রতিটি সিজদা যেন আমাদের এবং রবের মাঝখানের পর্দা সরিয়ে দেওয়ার একটি মাধ্যম হয়। যখন আমরা আমাদের জীবনের কোনো জটিল পরিস্থিতির সমাধান খুঁজে পাই না এবং কোনো কূলকিনারা করতে পারি না তখনও এই সিজদাই আমাদের আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয়। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেহেতু আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত তাই এই সময়টুকু তাঁর স্মরণে অতিবাহিত করা এবং তাঁরই হুকুমের কাছে নতি স্বীকার করা বুদ্ধিমানের কাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শিখিয়েছেন যে আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি এতটাই দয়ালু যে তিনি তার প্রতি এক হাত অগ্রসর হন যখন বান্দা তাঁর দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে (সহীহ আল-বুখারী, ৭৫৩৬)। এই যে রবের দ্রুত ধাবিত হওয়া এটিই মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় আশা এবং ভরসার কেন্দ্রবিন্দু।

পরিশেষে আমাদের এই সংক্ষিপ্ত জীবনের প্রতিটি বাঁক এবং প্রতিটি পরীক্ষা যেন আমাদের আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে। আমাদের জীবনের শেষ মুহূর্তটি যেন ঈমানের সাথে এবং আল্লাহর জিকিরের মধ্য দিয়ে কাটে সেই আকাঙ্ক্ষা প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে থাকা উচিত। দুনিয়াতে আমরা যা কিছু অর্জন করি না কেন আখেরাতে আমাদের সাথে কেবল আমাদের ইমান এবং সবরটুকুই যাবে। কবরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে শুরু করে হাশরের ময়দান পর্যন্ত আল্লাহর রহমত ছাড়া আমাদের আর কোনো ত্রাণকর্তা নেই। তাই আসুন আমরা আমাদের জীবনের প্রতিটি ব্যর্থতাকে তাঁর পরীক্ষা হিসেবে মেনে নেই এবং প্রতিটি সাফল্যকে তাঁর দান হিসেবে শুকরিয়া আদায় করি। আমাদের প্রতিটি নীরব কান্না যেন আল্লাহর আরশের দিকে ছুটে যায় এবং আমাদের অন্তরকে তাঁর অনন্ত দয়া ও করুণা দিয়ে পূর্ণ করে দেয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে জীবনের প্রতিটি ফয়সালা মেনে নেওয়ার তৌফিক দান করুন এবং আমাদের ইবাদতসমূহ কবুল করে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ মাকাম নসিব করুন যেখানে আল্লাহর সান্নিধ্য কখনও বিচ্ছিন্ন হবে না। আমীন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

মোটিভেশন বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!