শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৮ ফাল্গুন ১৪৩২

জুতার ফিতা চাইতেও কি আল্লাহর কাছে লজ্জা পান? দোয়ার গুরুত্ব

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম
জুতার ফিতা চাইতেও কি আল্লাহর কাছে লজ্জা পান? দোয়ার গুরুত্ব

ছোট চাওয়ার বড় মহিমা / Ai

মানুষের হৃদয়ের গভীরতম কোণে মাঝে মাঝে এক অদ্ভুত ও নীরব দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় যা তার আধ্যাত্মিক যাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। জীবনের নানাবিধ প্রয়োজনের ভিড়ে যখন খুব ছোট বা সামান্য কোনো অভাব দেখা দেয় তখন আমাদের মন এক দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুখে পড়ে। সেই মুহূর্তে অবচেতন মনে প্রশ্ন জাগে যে মহাবিশ্বের এই বিশাল স্রষ্টার কাছে কি আমার এই সামান্য বিষয়টি নিয়ে হাত তোলা ঠিক হবে? আমরা অনেক সময় মনে করি যে আল্লাহ তো অনেক বড় এবং তাঁর সাম্রাজ্য অসীম তাই আমার এই তুচ্ছ জুতার ফিতা ছিঁড়ে যাওয়া বা নগণ্য কোনো চাওয়া হয়তো তাঁকে বিরক্ত করবে। এই যে এক ধরণের কৃত্রিম লজ্জা যা আমাদের দোয়ার জন্য হাত তুলতে বাধা দেয় তা আসলে আমাদের বিশ্বাসের এক সুক্ষ্ম দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে। অথচ ইসলামের মৌলিক শিক্ষা আমাদের এই ধারণাকে সম্পূর্ণ আমূল বদলে দেয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর বান্দার প্রতিটি আকুতি শোনার জন্য সবসময় উন্মুখ থাকেন এবং তিনি চান বান্দা তার ছোট থেকে বড় প্রতিটি প্রয়োজনে একমাত্র তাঁরই মুখাপেক্ষী হোক। এই চাওয়া কেবল একটি চাহিদা পূরণ নয় বরং এটি বান্দা ও রবের মধ্যকার ভালোবাসার এক পরম বহিঃপ্রকাশ।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আল-ক্বাদির বা সর্বশক্তিমান হিসেবে পরিচিত যার কাছে বড় বা ছোট বলতে কোনো পার্থক্য নেই। তাঁর অসীম ক্ষমতার কাছে একটি পাহাড় সৃষ্টি করা যেমন সহজ ঠিক তেমনি একটি ধূলিকণা নিয়ন্ত্রণ করাও সমান সহজ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ মানুষের দারিদ্র্য ও নিজের অভাবমুক্ততাকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সূরা ফাতিরের ১৫ নম্বর আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন যে হে মানুষ তোমরা আল্লাহর মুখাপেক্ষী বা দরিদ্র আর আল্লাহই অভাবমুক্ত ও প্রশংসিত (সূরা ফাতির, ৩৫:১৫)। এই আয়াতের গূঢ় অর্থ হলো মানুষ তার অস্তিত্বের প্রতিটি সেকেন্ডে আল্লাহর দয়ার ওপর নির্ভরশীল। আমাদের এই চিরস্থায়ী নির্ভরশীলতাই আমাদের বাধ্য করে প্রতিটি প্রয়োজনে তাঁর দিকে ফিরে তাকাতে। যখন আমরা সামান্য বিষয় আল্লাহর কাছে চাই তখন আমরা আসলে স্বীকার করি যে আমরা তাঁর ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতম নেয়ামত ছাড়া এক মুহূর্তও চলতে পারি না। এটি আল্লাহর আল-ওয়াহহাব বা মহাদাতা নামের এক পরম মহিমা যা বান্দাকে নিঃশর্তভাবে নেয়ামত দান করে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের দোয়ার এই আধ্যাত্মিক দর্শনের শিক্ষা দিয়েছেন অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে। একটি বিখ্যাত হাদিসে তিনি আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন যে তোমাদের প্রত্যেকেই যেন তার রবের কাছে তার সমস্ত প্রয়োজন চায় এমনকি তার জুতার ফিতাও যদি ছিঁড়ে যায় তবুও যেন তা আল্লাহর কাছে চায় (সুনানে তিরমিযী, ৩৬০৪)। এই হাদিসটি কেবল জুতার ফিতার বিষয় নয় বরং এটি মানুষের মানসিকতাকে এক পরম নির্ভরশীলতার দিকে ধাবিত করার প্রশিক্ষণ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বোঝাতে চেয়েছেন যে কোনো কিছুই তুচ্ছ নয় যদি তা আপনার প্রয়োজনে লাগে। যখন একজন বান্দা তার সামান্য প্রয়োজনের জন্য আল্লাহর কাছে হাত পাতে তখন সে প্রমাণ করে যে তার জীবনে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো প্রকৃত আশ্রয়দাতা নেই। এটিই হলো ইবাদতের মগজ বা সারকথা কারণ দোয়া কেবল প্রয়োজনের নাম নয় বরং দোয়া হলো দাসত্বের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহ তায়ালা সূরা গাফিরে ওয়াদা করেছেন যে তোমরা আমাকে ডাকো আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব (সূরা গাফির, ৪০:৬০)। এখানে আল্লাহ কোনো সীমারেখা টেনে দেননি যে কেবল বড় বিপদে তাঁকে ডাকতে হবে।

জীবনের এই আধ্যাত্মিক জাগরণ আমাদের দৈনন্দিন মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দেওয়ার এক অব্যর্থ ঔষধ। যখন আমরা আমাদের প্রতিটি ছোট দুশ্চিন্তা আল্লাহর সামনে পেশ করি তখন আমাদের মন এক অদ্ভুত প্রশান্তি লাভ করে। আধুনিক মনোবিজ্ঞান অনেক সময় ছোট ছোট উদ্বেগ জমা করে রাখাকে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করে। ইসলাম আমাদের শেখায় সেই সমস্ত ভার আল্লাহর হাতে সঁপে দিতে। এই প্রক্রিয়ায় তিনটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি যা হলো ইয়াকীন বা অবিচল আস্থা, ইস্তেগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা এবং সবর বা ধৈর্য। দোয়ার সময় এই বিশ্বাস রাখা প্রয়োজন যে আমার রব আমার প্রতিটি শব্দ শুনছেন এবং তিনি অবশ্যই এর সর্বোত্তম সমাধান দান করবেন। অনেক সময় আমাদের পাপের কারণে আমরা রবের কাছে চাইতে সংকোচ বোধ করি কিন্তু মনে রাখা উচিত যে তওবা বা অনুশোচনা সকল বাধার প্রাচীর ভেঙে দেয়। দোয়ার ফল তাৎক্ষণিকভাবে না পেলেও হতাশ হওয়া মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয় কারণ আল্লাহ হয়তো এর চেয়ে উত্তম কিছু আমাদের জন্য আখেরাতে সঞ্চয় করে রাখছেন।

পরিশেষে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে এই পৃথিবী কেবল একটি সাময়িক পরীক্ষাগার যেখানে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। আমরা যদি আমাদের জীবনকে সাদাকাহ বা ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহর পথে পরিচালিত করি তবে আমাদের জীবনের বন্ধনগুলো শিথিল হবে এবং আমরা প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করব। কুরআনের সাথে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করা আমাদের এই আধ্যাত্মিক চেতনাকে আরও উজ্জ্বল করবে। সামান্য জিনিস চাইতে গিয়ে যে লজ্জা আমাদের গ্রাস করে তা মূলত শয়তানের এক সুক্ষ্ম ধোঁকা যা আমাদের আল্লাহর দয়া থেকে বঞ্চিত করতে চায়। আসুন আমরা আমাদের জুতার ফিতা থেকে শুরু করে জান্নাতুল ফিরদাউস পর্যন্ত সবকিছুই কেবল আল্লাহর কাছে চাই। কারণ তিনি আমাদের অতি নিকটবর্তী এবং তিনি তাঁর বান্দার লজ্জাকে সম্মানে রূপান্তরিত করতে সক্ষম। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর মুখাপেক্ষী হওয়ার এবং তাঁর দরবারে নিবিষ্টচিত্তে দোয়া করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

কোরআন বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!