রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৯ ফাল্গুন ১৪৩২

ঈদ উদযাপনের প্রকৃত তাৎপর্য ও ইসলামের দৃষ্টিতে এর গুরুত্ব

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬, ০৫:২৭ পিএম
ঈদ উদযাপনের প্রকৃত তাৎপর্য ও ইসলামের দৃষ্টিতে এর গুরুত্ব

ত্যাগের মহিমায় ঈদ উদযাপন / Ai

বছরের পর বছর ধরে বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহ আকাশের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকে এক ফালি সরু বাঁকা চাঁদের অপেক্ষায়। সেই চাঁদের উপস্থিতি পশ্চিম আকাশে নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথেই মুমিনের হৃদয়ে আনন্দের এক অবারিত স্রোত বয়ে যায়। ঈদ শব্দটির অর্থ এবং এর গভীরতা কেবল উৎসবের মাঝে সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি আমাদের জীবনে নিয়ে আসে এক অনাবিল প্রশান্তি এবং ভ্রাতৃত্বের এক মহান বার্তা। ছোট বড় ধনী গরিব নির্বিশেষে সবাই এই দিনটির জন্য মাসব্যাপী অপেক্ষা করে। নতুন পোশাকের সুবাস এবং সেমাই পায়েসের মিষ্টি ঘ্রাণে চারপাশ উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। কিন্তু একজন সচেতন মুমিন হিসেবে আমাদের নিভৃতে চিন্তা করা প্রয়োজন যে ঈদ আসলে কী এবং ঈদ উদযাপনের প্রকৃত তাৎপর্য আমাদের জীবনে কতটুকু প্রভাব ফেলে। ঈদ কি শুধুই নতুন জামা পরা বা বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ানোর অবকাশ নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে মহান রবের এক গভীর হিকমত ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব। আমরা অনেকেই ঈদকে নিছক একটি উৎসব মনে করি অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে ঈদ হলো ইবাদত ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক মহোৎসব।

আরবি আউদ শব্দমূল থেকে ঈদ শব্দের উৎপত্তি যার অর্থ হলো ফিরে আসা বা বারবার আগমন করা। যেহেতু এই দিনটি প্রতি বছর নতুন আনন্দ আর বার্তা নিয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসে তাই একে ঈদ বলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে ঈদের সূচনা হয়েছিল এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় এলেন তখন তিনি দেখলেন মদিনাবাসী জাহেলি যুগের প্রথা অনুযায়ী নওরোজ ও মেহেরজান নামক দুটি উৎসব পালন করছে যাতে অশ্লীলতা আর অনর্থক খেলাধুলার ছড়াছড়ি ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সতর্ক করে বললেন যে আল্লাহ তাআলা তোমাদের এই দুটি দিনের পরিবর্তে এর চেয়েও উত্তম দুটি দিন দান করেছেন যার একটি হলো ঈদুল ফিতর এবং অপরটি হলো ঈদুল আযহা (সুনানে আবু দাউদ, ১১৩৪)। লক্ষ্য করার বিষয় হলো আল্লাহ তাআলা জাহেলি উৎসবের পরিবর্তে আমাদের এমন দুটি উৎসব দিলেন যার ভিত্তি কোনো কুসংস্কার বা অশ্লীলতার ওপর নয় বরং যার ভিত্তি হলো তাওহীদ ও ইবাদত।

ঈদুল ফিতর বা রোজা ভাঙার উৎসব মূলত দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর এক বিশাল পুরস্কার। রমজান মাসজুড়ে একজন মুমিন যখন দিনের বেলা পানাহার বর্জন করে এবং নফসের সাথে জিহাদ করে তখন আল্লাহ তাকে পুরস্কৃত করার জন্য এই দিনটি দান করেন। এটি মুমিনের জন্য এক আধ্যাত্মিক বিজয় দিবস। এই দিনটি প্রমাণ করে যে বান্দা তার রবের হুকুম মেনে নিজের প্রবৃত্তি বা নফসকে পরাজিত করতে পেরেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা রোজা ও ঈদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন যে যাতে তোমরা নির্ধারিত সংখ্যা পূরণ করতে পার এবং তোমাদেরকে যে সুপথ দেখিয়েছেন তার জন্য তোমরা আল্লাহর বড়ত্ব বা তাকবীর প্রকাশ কর এবং তাঁর কৃতজ্ঞ হও (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৫)। ঈদের দিন সকালে যে তাকবীর ধ্বনি আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলে তা মূলত আল্লাহর সেই হেদায়েতের শুকরিয়া আদায় করা। অন্যদিকে ঈদুল আযহা বা ত্যাগের ঈদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের সেই অসামান্য ত্যাগের কথা। যখন আল্লাহ তাঁকে প্রিয় পুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালামকে কুরবানি করার আদেশ দিলেন তখন পিতা পুত্র উভয়েই আল্লাহর হুকুমের সামনে মাথা নত করে দিয়েছিলেন। তাঁদের সেই ত্যাগের স্মৃতিকে জাগরূক রাখতেই জিলহজ মাসে আমরা পশু কুরবানি করি। তবে মনে রাখতে হবে যে ঈদের এই কুরবানি শুধুই পশু জবাই করা নয় বরং এর মূল লক্ষ্য হলো তাকওয়া অর্জন। আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে আল্লাহর কাছে এগুলোর গোশত এবং রক্ত পৌঁছায় না বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (সূরা আল-হজ্জ, ২২:৩৭)।

ঈদের আধ্যাত্মিক গুরুত্ব অপরিসীম কারণ এটি হলো ক্ষমার দিন ও পুরস্কারের দিন। হাদিসে এসেছে যে ঈদের দিন সকালে আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের মাঝে তাঁর বান্দাদের নিয়ে গর্ব করেন এবং তাঁদের সকল দোয়া কবুল করে পাপগুলো ক্ষমা করে দেওয়ার ঘোষণা দেন (বায়হাকি, শুয়াবুল ঈমান)। এটি প্রমাণ করে যে ঈদ মুমিনের জন্য এক আধ্যাত্মিক রিচার্জ স্টেশন। সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও ঈদের গুরুত্ব বিশাল। ইসলাম এমন এক ধর্ম যা কখনো একা একা আনন্দে মেতে থাকাকে সমর্থন করে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদের দিন এমন এক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করে দিয়ে গেছেন যেখানে ধনী ও গরিবের ব্যবধান মুছে যায়। ঈদুল ফিতরের নামাজের আগেই সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব করা হয়েছে যাতে এই দিনে দরিদ্রদের কারো কাছে হাত পাততে না হয় (সুনানে ইবনে মাজাহ)। অর্থাৎ ঈদের আনন্দ যেন সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষটিও উপভোগ করতে পারে সেটি নিশ্চিত করাই ঈদের অন্যতম লক্ষ্য। একইভাবে ঈদুল আযহায় কুরবানির গোশত বন্টনের মাধ্যমে সমাজে সম্পদ বন্টনের ভারসাম্য তৈরি হয়।

ঈদ হলো মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক যা আমাদের এক দেহের মতো সংযুক্ত করে। ঈদের জামাত সাধারণত বড় ময়দান বা ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হয় যেখানে রাজা প্রজা ধনী গরিব সবাই এক কাতারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়। কারো জন্য কোনো বিশেষ আসন থাকে না এবং সিজদায় গিয়ে সবার মাথা একই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এই দৃশ্য প্রমাণ করে যে আল্লাহর কাছে পদমর্যাদা বা সম্পদের কোনো মূল্য নেই বরং মূল্য আছে কেবল তাকওয়ার। ঈদের কোলাকুলি এবং শুভেচ্ছা বিনিময় আমাদের ভেতর থেকে হিংসা ও অহংকার দূর করে ভালোবাসার সেতু তৈরি করে। ঈদ আমাদের শেখায় যে একজনের আনন্দে সবাই আনন্দিত হওয়া এবং একজনের কষ্টে সবাই ব্যথিত হওয়া প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। ইসলাম আনন্দ ও বিনোদনকে হালাল করেছে যদি তা শরীয়তের গণ্ডির মধ্যে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগেও ঈদের দিনে হাবশি সাহাবীরা মসজিদে নববীতে বল্লম খেলা দেখাতেন যা আনন্দ প্রকাশের একটি মাধ্যম ছিল।

পরিশেষে ঈদ কোনো গতানুগতিক উৎসব নয় বরং এটি মুমিনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ মেহমানদারি। ঈদের আনন্দ তখনই সার্থক হবে যখন আমরা এই শিক্ষাগুলোকে ব্যক্তিজীবনে ধারণ করতে পারব এবং অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারব। ঈদ উদযাপনের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে আত্মত্যাগের মানসিকতা ও রবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মধ্যে। আমরা যেন ভুলে না যাই যে এই আনন্দের দিনেও আমাদের প্রতিবেশী বা আত্মীয়দের মধ্যে কেউ অভুক্ত আছে কি না। ঈদের এই পবিত্র দিনে নির্যাতিত মুসলিম ভাই বোনদের জন্য দোয়া করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ঈদের প্রকৃত হক আদায় করার এবং এর মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভ করার তৌফিক দান করুন। আমাদের জীবনে ঈদ বারবার ফিরে আসুক ঈমান ও আমানতদারিতার সাথে এবং আমাদের সকল ইবাদত কবুল হোক।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

সংবাদ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!