মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন হলো মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা বা দোয়া। বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে মুমিন বান্দা তার রবের কাছেই হাত পাতে এবং মনের সমস্ত আকুতি উজার করে দেয়। অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ অত্যন্ত কাতর হয়ে কাঁদছে, তার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে, কণ্ঠস্বর কাঁপছে, তবুও যেন তার সেই দীর্ঘ আর্তি আসমানের মালিকের দরবারে কবুল হচ্ছে না। এই এক অসহ্য যন্ত্রণার মুহূর্ত যখন বান্দা মনে করে আল্লাহ হয়তো তাকে ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হয়তো ভিন্ন। ইসলামের সুমহান শিক্ষা আমাদের জানায় যে, দোয়া কবুলের জন্য কেবল আবেগ বা চোখের জলই যথেষ্ট নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন একটি পবিত্র সত্তা ও পরিচ্ছন্ন জীবন। আধ্যাত্মিক জগতে বান্দার ডাক এবং আল্লাহর সাড়া দেওয়ার মাঝখানে যদি কোনো বিশাল প্রাচীর তৈরি হয়, তবে তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো হারাম উপার্জন। রিযিকের এই অপবিত্রতা কেবল একজন মানুষের জাগতিক জীবনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং তার পরকালীন গন্তব্য ও বর্তমান ইবাদতের সমস্ত ভিত্তি ধুলোয় মিশিয়ে দেয়।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে মুমিনদের জন্য একটি শাশ্বত মূলনীতি ঘোষণা করেছেন যা কেবল টিকে থাকার জন্য নয় বরং আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের জন্য অপরিহার্য। আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন যে হে মানবজাতি তোমরা পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র আছে তা আহার করো (সূরা আল-বাকারা, ২:১৬৮)। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো আল্লাহ কেবল `হালাল` হওয়ার শর্ত দেননি বরং এর সাথে `তায়্যিব` বা পবিত্র হওয়ার শর্তও জুড়ে দিয়েছেন। এর অর্থ হলো উপার্জনের মাধ্যমটি যেমন শরীয়তসম্মত হতে হবে তেমনি সেই উপার্জনের প্রতিটি কণা হতে হবে সন্দেহাতীতভাবে পরিচ্ছন্ন। যখন একজন মানুষ অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করে তখন সে মূলত আল্লাহর সেই ঐশী আইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে যা তার নিজের সুরক্ষার জন্যই তৈরি করা হয়েছিল। এই অবাধ্যতা তার জীবনের বরকত বা অদৃশ্য কল্যাণকে মুহূর্তেই নিঃশেষ করে দেয় এবং তার আত্মাকে এক অন্ধকার গহ্বরে নিক্ষেপ করে।
হারাম উপার্জনের ফলে দোয়া প্রত্যাখ্যাত হওয়ার বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি কালজয়ী হাদিস আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে যে নবীজি একজন ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত পর্যটকের কথা উল্লেখ করেছেন যার চুলগুলো ধূলিমলিন এবং সে অত্যন্ত কাতর হয়ে আসমানের দিকে হাত তুলে ডাকছে ইয়া রব ইয়া রব বলে। দোয়া কবুলের জাগতিক সকল শর্তই সেখানে বিদ্যমান ছিল কারণ মুসাফিরের দোয়া সাধারণত কবুল হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই দৃশ্য দেখে মন্তব্য করলেন যে ওই ব্যক্তির খাদ্য হারাম পানীয় হারাম পোশাক হারাম এবং তার শরীরের বৃদ্ধি ঘটেছে হারামের মাধ্যমে এমতাবস্থায় কীভাবে তার দোয়া কবুল হতে পারে (সহীহ মুসলিম, ১০১৫)। এই হাদিসটি প্রতিটি মুসলিমের জন্য এক চূড়ান্ত সতর্কবাণী। এটি প্রমাণ করে যে আপনি যতই বিনয়ী হোন বা রজনী জেগে ইবাদত করুন যদি আপনার রক্ত ও মাংস হারাম খাদ্যের পুষ্টিতে তৈরি হয় তবে আপনার প্রার্থনা মহান আল্লাহর আরশ স্পর্শ করতে ব্যর্থ হবে।
পবিত্রতা ছাড়া মহান আল্লাহ কোনো ইবাদত বা দান গ্রহণ করেন না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট করেছেন যে আল্লাহ স্বয়ং পবিত্র এবং তিনি শুধু পবিত্র বস্তুকেই কবুল করেন (সহীহ মুসলিম, ১০১৫)। এর ফলে দেখা যায় মানুষ অনেক সময় হারাম টাকা দিয়ে হজ সম্পাদন করে কিংবা অকাতরে দান-সাদাকাহ করে কিন্তু সেই আমলগুলো আল্লাহর কাছে কোনো মূল্য বহন করে না। বরং সেই অপবিত্র অর্থ দিয়ে পুষ্ট হওয়া দেহটি পরকালে কেবল আগুনের উপযোগী হয়ে দাঁড়ায়। হাদিসে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে যে যে দেহ হারাম খাদ্য দ্বারা গড়ে উঠেছে জাহান্নামই তার জন্য উপযুক্ত আবাস (সুনানে তিরমিযী, ৬১৪)। বর্তমানে আমাদের সমাজে হারামের অনুপ্রবেশ ঘটছে নানাবিধ উপায়ে। সুদ বা রিবা যা আধুনিক অর্থব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে তা আসলে আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। ঘুষ বা উৎকোচ যা সমাজের ন্যায়বিচারকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয় তা-ও জীবনের সমস্ত বরকত কেড়ে নেয়। ব্যবসায়িক প্রতারণা মাপে কম দেওয়া ভেজাল মেশানো এবং মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রি করার মতো বিষয়গুলো একজন মানুষের সমস্ত ইবাদতকে অর্থহীন করে দেয়।
হারাম উপার্জনের প্রভাব কেবল ব্যক্তিগত জীবনের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং এটি পুরো পরিবার ও পরবর্তী প্রজন্মের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। হারাম টাকা দিয়ে যখন কোনো বাবা তার সন্তানকে লালন-পালন করেন তখন সেই অপবিত্র রক্ত সন্তানের চরিত্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। ফলে সন্তান অবাধ্য হয় এবং তাদের হৃদয়ে আল্লাহর ভয় ও নৈতিকতা লোপ পায়। পরিবারে কলহ অশান্তি এবং অনাকাঙ্ক্ষিত রোগ-বালাইয়ের প্রাদুর্ভাব মূলত বরকত হ্রাসেরই বহিঃপ্রকাশ। যে হৃদয়ে হারাম টাকা প্রবেশ করে সেখানে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা প্রশান্তি বা `সাকীনাহ` কোনোভাবেই স্থায়ী হতে পারে না। সেই ব্যক্তি সবসময় এক ধরনের অজানা ভয় ও মানসিক অস্থিরতায় ভোগে যা কোনো জাগতিক সম্পদ দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়।
এই বিপর্যয় থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো তাৎক্ষণিক তওবা এবং সম্পদের পবিত্রকরণ। যদি অতীতে কারো জীবনে হারামের স্পর্শ লেগে থাকে তবে তাকে আজই রবের কাছে লজ্জিত হয়ে ক্ষমা চাইতে হবে। কেবল মৌখিক ক্ষমা প্রার্থনাই যথেষ্ট নয় বরং সেই উপার্জিত অবৈধ অর্থ যদি সম্ভব হয় তার প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দিতে হবে। যদি মালিককে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হয় তবে সেই অর্থ সওয়াবের আশা ছাড়াই গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে নিজের বোঝা হালকা করতে হবে। হালাল উপার্জনের পরিমাণ কম হলেও তার মধ্যে যে বরকত ও তৃপ্তি থাকে তা হারামের বিশাল পাহাড়ের মাঝেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের শিখিয়েছেন একটি বিশেষ দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে হালাল রিযিকের প্রার্থনা করতে যেখানে বলা হয়েছে হে আল্লাহ তুমি তোমার হালাল দ্বারা আমাকে তোমার হারাম থেকে যথেষ্ট করে দাও এবং তোমার অনুগ্রহ দ্বারা অন্য সকলের থেকে অমুখাপেক্ষী করো (সুনানে তিরমিযী, ৩৫৬৩)। আমাদের প্রত্যেকের উচিত এই দোয়ার মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপকে পবিত্র রাখা যাতে আমাদের আর্তনাদ সরাসরি মহান আল্লাহর আরশে কবুলিয়াত লাভ করে।

আপনার মতামত লিখুন :