২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের ৪৮টি দলের চূড়ান্ত লাইনআপ নিশ্চিত হয়েছে বলে ১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিবিসি স্পোর্টসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। গতকাল ৩১ মার্চ উয়েফা এবং আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের মাধ্যমে শেষ ছয়টি দল মূল পর্বে জায়গা করে নেওয়ার পর এই তালিকা পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়েছে।
এই মহাযজ্ঞে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখা দিয়েছে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালির বিদায়। প্লে-অফে বসনিয়া-হার্জেগোভিনার কাছে হেরে আজ্জুরিরা টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্ব আসর থেকে ছিটকে গেছে।
ইতালির বিদায়ে শোকের ছায়া নেমে আসলেও চেক প্রজাতন্ত্র, তুরস্ক এবং সুইডেনের মতো ইউরোপীয় শক্তিগুলো তাদের টিকিট নিশ্চিত করেছে। এশিয়ান অঞ্চল থেকে ইরাক এবং আফ্রিকা থেকে ডিআর কঙ্গো প্লে-অফে যথাক্রমে বলিভিয়া এবং জ্যামাইকাকে হারিয়ে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে স্থান করে নিয়েছে।
আসন্ন এই টুর্নামেন্টটি আগামী ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডায় অনুষ্ঠিত হবে। ৩২ দলের পরিবর্তে ৪৮ দলের অংশগ্রহণে এটিই হতে যাচ্ছে ইতিহাসের বৃহত্তম বিশ্বকাপ। তিনটি দেশের ১৬টি শহরে মোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। ১১ জুন মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আসতেকা স্টেডিয়ামে মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে এই আসরের পর্দা উঠবে।
মেক্সিকো প্রথম দেশ হিসেবে তিনবার বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের গৌরব অর্জন করতে যাচ্ছে। টুর্নামেন্টের নতুন ফরম্যাট অনুযায়ী ৪৮টি দলকে ১২টি গ্রুপে ভাগ করা হবে যেখানে প্রতিটি গ্রুপে চারটি করে দল থাকবে। প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল এবং আটটি সেরা তৃতীয় স্থান অধিকারী দল নকআউট পর্বে উন্নীত হবে যা ৩২ দলের রাউন্ড দিয়ে শুরু হবে। ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনাল ম্যাচের মাধ্যমে নতুন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন মুকুট পরবে।
বিশ্বকাপের সময়সূচি নিয়ে ইউরোপীয় এবং এশিয়ান দর্শকদের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর খবর রয়েছে বলে বিবিসি স্পোর্টস জানিয়েছে। যেহেতু ম্যাচগুলো চারটি ভিন্ন টাইম জোনে এবং প্রায় ২,৮০০ মাইলের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত হবে, তাই মোট ১৩টি ভিন্ন কিক-অফ টাইম নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপের দর্শকদের জন্য অনেক ম্যাচ মধ্যরাতে বা শেষ রাতে শুরু হবে।
যেমন কানসাস সিটির গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচ যুক্তরাজ্যের সময় অনুযায়ী গভীর রাতে অনুষ্ঠিত হবে। সান ফ্রান্সিসকো এবং ভ্যানকুভারে অনুষ্ঠিত কিছু ম্যাচ ইউরোপীয় সময় অনুযায়ী ভোর ৫টায় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। গ্রুপ পর্বের মোট ৭২টি ম্যাচের মধ্যে প্রায় অর্ধেক ম্যাচই গভীর রাতে বা ভোরের দিকে শুরু হবে যা বিশ্বজুড়ে দর্শকদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দল গ্রুপ ‘এল’-এ ক্রোয়েশিয়া, ঘানা এবং পানামার মুখোমুখি হবে। থমাস টুখেলের অধীনে ইংল্যান্ড তাদের বাছাইপর্বের সবকটি ম্যাচ জিতে এবং কোনো গোল হজম না করে বিশ্বকাপের মূল পর্বে এসেছে। অন্যদিকে স্কটল্যান্ড গ্রুপ ‘সি’-তে হাইতি, মরক্কো এবং ব্রাজিলের সাথে লড়াই করবে। ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে এবার শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাদের দলে পেদ্রি, ফাবিয়ান রুইজ এবং ২০২৪ সালের ব্যালন ডি’অর বিজয়ী রদ্রি এবং তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালের মতো ফুটবলাররা রয়েছেন।
এছাড়া কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্স এবং বর্তমান চ্যাম্পিয়ন লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে শক্তিশালী প্রতিযোগী হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। ব্রাজিল বাছাইপর্বে কিছুটা নড়বড়ে পারফরম্যান্স দেখালেও পঁচিশের আসরে তারা ঘুরে দাঁড়াবে বলে সমর্থকদের আশা।
২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণ হতে যাচ্ছে নবাগত চারটি দল—কুরাকাও, কেপ ভার্দে, উজবেকিস্তান এবং জর্ডান। ক্যারিবীয় অঞ্চলের ছোট্ট দ্বীপ কুরাকাও বিশ্বকাপের ইতিহাসে অংশগ্রহণকারী ক্ষুদ্রতম দেশ হতে যাচ্ছে যাদের জনসংখ্যা মাত্র দেড় লক্ষের মতো। এছাড়া কেপ ভার্দে তাদের বাছাইপর্বে ক্যামেরুনকে পেছনে ফেলে মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে। এশিয়ান ফুটবল থেকে ফ্যাবিও ক্যানাভারোর প্রশিক্ষণে উজবেকিস্তান তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে নাম লেখালো। জর্ডানও তাদের ধারাবাহিক উন্নতির ধারাবাহিকতায় এবার আর্জেন্টিনাকে মোকাবিলা করার সুযোগ পেয়েছে।
অন্যদিকে ম্যানচেস্টার সিটির তারকা আর্লিং হালান্দের নরওয়ে দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরেছে এবং হালান্দ বাছাইপর্বে রেকর্ড ১৬টি গোল করেছেন। পরিবেশবিদরা এই বিশ্বকাপকে ‘সবচেয়ে বেশি দূষণকারী বিশ্বকাপ’ হিসেবে উল্লেখ করলেও ফিফা এবং আয়োজক দেশগুলো একটি সফল টুর্নামেন্ট উপহার দিতে বদ্ধপরিকর।

আপনার মতামত লিখুন :