বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল, ২০২৬, ১৮ চৈত্র ১৪৩২

২০ মিনিট প্রকৃতির সান্নিধ্য: সুস্বাস্থ্যের এক নতুন দাওয়াই

উম্মাহ কণ্ঠ এপ্রিল ১, ২০২৬, ০৩:৫৪ পিএম
২০ মিনিট প্রকৃতির সান্নিধ্য: সুস্বাস্থ্যের এক নতুন দাওয়াই

বিবিসি নিউজের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে প্রতিদিন মাত্র ২০ মিনিট প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবিক প্রক্রিয়ায় পরিমাপযোগ্য এবং ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। গবেষকদের মতে বাইরে সময় কাটানোর এই অভ্যাসটি কেবল মানসিক প্রশান্তিই দেয় না বরং এটি স্ট্রেস

 হরমোন কমাতে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং এমনকি অন্ত্রের স্বাস্থ্যের উন্নতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে সর্বোচ্চ সুফল পাওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটার প্রয়োজন নেই বরং দিনে মাত্র ২০ মিনিট কোনো পার্কে বা সবুজ পরিবেশে সময় কাটানোই যথেষ্ট।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববৈচিত্র্যের অধ্যাপক ব্যারনেস ক্যাথি উইলিস বিবিসি রেডিও ৪-এর একটি পডকাস্টে জানান যে যখন মানুষ সবুজ গাছপালা দেখে বা পাখির ডাক শোনে তখন শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়। এর ফলে রক্তচাপ কমে আসে এবং হৃদস্পন্দনের গতি ধীর হয়ে যায় যা শরীরকে শারীরবৃত্তীয়ভাবে শান্ত করতে সাহায্য করে।

যুক্তরাজ্যে প্রায় ২০ হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যারা সপ্তাহে অন্তত ১২০ মিনিট বা দুই ঘণ্টা সবুজের মাঝে কাটান তারা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি সুস্থ এবং মানসিকভাবে সুখী থাকেন। এই বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে বর্তমানে কিছু কিছু এলাকায় গ্রিন সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং বা সামাজিক সবুজ ব্যবস্থাপনার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হয়েছে যেখানে মানুষকে সুস্থ রাখার জন্য প্রকৃতির সাথে যুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

 ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিং কুও জানান যে প্রকৃতিতে সময় কাটালে শরীরের এন্ডোক্রাইন সিস্টেম সক্রিয় হয় এবং কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমিয়ে দেয়। জাপানি সাইপ্রেস বা হিনোকি তেলের ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে এই তেলের ঘ্রাণ রক্তে ন্যাচারাল কিলার সেলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় যা শরীরের ভাইরাস প্রতিরোধের ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে।

অধ্যাপক কুওর মতে প্রকৃতিতে কাটানো একটি দীর্ঘ সপ্তাহান্ত শরীরের ভাইরাস প্রতিরোধী ব্যবস্থাকে এতটাই শক্তিশালী করতে পারে যে এক মাস পরেও তার প্রভাব সাধারণ অবস্থার তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি থাকে।ঘ্রাণশক্তির মাধ্যমেও প্রকৃতি আমাদের শরীরে শক্তিশালী প্রভাব ফেলে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। গাছপালা এবং মাটি থেকে নির্গত জৈব যৌগগুলো শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে আমাদের রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে।

অধ্যাপক উইলিস জানান যে পাইন বনের ঘ্রাণ মাত্র ৯০ সেকেন্ডের মধ্যে একজন মানুষকে শান্ত করতে শুরু করে এবং এর প্রভাব প্রায় ১০ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এমনকি শিশুদের ওপর করা গবেষণাতেও দেখা গেছে যে লেবুর ঘ্রাণ বা লিমোনিন নামক যৌগটি তাদের শান্ত করতে সহায়তা করে। এছাড়া প্রকৃতির সাথে সংস্পর্শ মানুষের শরীরের মাইক্রোবায়োম বা অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে।

মাটি ও উদ্ভিদের মধ্যে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রবায়োটিকের মতোই কাজ করে যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও শাণিত করে। সংক্রমণ বিজ্ঞানী ডক্টর ক্রিস ভ্যান টুলেকেন জানান যে মাটি নিয়ে খেলা করা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য এক ধরণের ইতিবাচক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে যা তাদের শরীরকে বিভিন্ন রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়।

যারা নিয়মিত বনে বা পার্কে যাওয়ার সুযোগ পান না তাদের জন্যও আশার কথা শুনিয়েছেন গবেষকরা। বাড়িতে ফুলের সান্নিধ্য বিশেষ করে সাদা বা হলুদ গোলাপ মস্তিষ্কের কার্যকলাপে শান্ত প্রভাব ফেলে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। এছাড়া এসেনশিয়াল অয়েল ডিফিউজার ব্যবহার করে পাইন বা অন্যান্য প্রাকৃতিক ঘ্রাণ ঘরের পরিবেশে যুক্ত করা যেতে পারে। এমনকি ল্যাপটপ বা কম্পিউটারে বনের ছবি দেখা কিংবা জানালার বাইরে সবুজের দিকে তাকিয়ে থাকাও মস্তিষ্কের তরঙ্গ পরিবর্তনে 

এবং মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। প্রকৃতির এই ছোট ছোট স্পর্শগুলোও আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝে শরীর ও মনকে সতেজ রাখার এক সহজ এবং কার্যকর উপায় হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

সংবাদ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!