এয়ার কানাডার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাইকেল রুসো আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে অবসরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, যা গত সোমবার কোম্পানির পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে বলে বিবিসির একটি বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
গত ২২ মার্চ নিউ ইয়র্কের লা গার্ডিয়া বিমানবন্দরে এয়ার কানাডার একটি বিমান দুর্ঘটনার পর শোকবার্তা প্রদানে ফরাসি ভাষা ব্যবহার না করায় তিনি তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়েছিলেন। ওই দুর্ঘটনায় এয়ারলাইন্সটির দুইজন পাইলট নিহত হন এবং বেশ কয়েকজন যাত্রী আহত হন।
রুসো সোমবার তার অবসরের কথা জানালেও কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে এটি একটি স্বাভাবিক অবসর এবং এর সঙ্গে সাম্প্রতিক ভাষা বিতর্কের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবে কানাডার বিশ্লেষক ও রাজনীতিবিদরা এই টাইমিং নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
গত ২২ মার্চ মন্ট্রিল থেকে ছেড়ে যাওয়া এয়ার কানাডার বিমানটি নিউ ইয়র্কে অবতরণের সময় একটি জরুরি যানের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, যা গত চার দশকের মধ্যে এয়ারলাইন্সটির প্রথম প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। এর ঠিক একদিন পর অর্থাৎ ২৩ মার্চ রুসো একটি চার মিনিটের ভিডিও বার্তা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন যেখানে তিনি ইংরেজি ভাষায় নিহত পাইলটদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
ভিডিওতে ফরাসি সাবটাইটেল থাকলেও তিনি নিজে ফরাসি ভাষায় কথা না বলায় কুইবেকের ফরাসিভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই বার্তাকে সমবেদনার অভাব হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং কুইবেকের রাজনীতিবিদরা অবিলম্বে রুসোর পদত্যাগ দাবি করেছিলেন।
কানাডার অফিশিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যাক্ট অনুযায়ী এয়ার কানাডা ইংরেজি ও ফরাসি—উভয় ভাষায় সেবা দিতে আইনিভাবে বাধ্য। যদিও ১৯৮৮ সালে এয়ারলাইন্সটি বেসরকারি খাতে চলে যায়, তবে জাতীয় প্রতীক হিসেবে এর দ্বিভাষিক বাধ্যবাধকতা বজায় রাখার জন্য আলাদা আইন পাস করা হয়েছিল। রুসো দীর্ঘ বছর মন্ট্রিলে বসবাস করলেও ফরাসি ভাষায় কথা বলতে না পারার কারণে এর আগেও সমালোচিত হয়েছিলেন।
২০২১ সালে সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ফরাসি ভাষায় প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়ে জানিয়েছিলেন যে তার কাজের চাপের কারণে তিনি ভাষা শেখার সময় পাননি। এই পুরনো বিতর্ক লা গার্ডিয়া দুর্ঘটনার পর নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে যা শেষ পর্যন্ত তার ক্যারিয়ারের সমাপ্তি টেনে দিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ফরাসি ভাষা ও সংস্কৃতির রক্ষক হিসেবে পরিচিত কুইবেক প্রদেশে এই ঘটনাকে ঐতিহাসিক অসম্মান হিসেবে দেখা হচ্ছে। কুইবেকের আইনপ্রণেতারা রুসোর পদত্যাগের দাবিতে একটি প্রতীকী প্রস্তাবও পাস করেছিলেন। কানাডিয়ান লেখক জ্যাক জেডওয়াব ফরাসি সংবাদপত্র `লা প্রেসে` লিখেছেন যে রুসোর এই আচরণ কর্মীদের কাছে এমন একটি বার্তা দেয় যে দ্বিভাষিকতা কোনো মূল্যবোধ নয় বরং একটি বোঝা।
অন্যদিকে টরন্টো বা ওন্টারিওর মতো ইংরেজিভাষী অঞ্চলের অনেকেই এই সমালোচনার তীব্রতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে এটি একটি মানবিক ট্র্যাজেডি এবং একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা উচিত নয়। ওন্টারিওর কিছু বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন যে রাজনীতিবিদরা ফরাসি ভোটারদের তুষ্ট করার জন্য এই শোকাবহ ঘটনাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।
কানাডার রাজনীতিতে দ্বিভাষিকতার গুরুত্ব এতটাই বেশি যে প্রধানমন্ত্রীর পদের জন্য যে কোনো প্রার্থীর উভয় ভাষায় পারদর্শিতা থাকা একটি অলিখিত নিয়ম। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নিজেও গত বছর নির্বাচনে দাঁড়ানোর আগে তার ফরাসি ভাষা উন্নত করতে কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন। রুসোর এই বিদায় কেবল একজন কর্পোরেট নেতার প্রস্থান নয় বরং এটি কানাডার জাতীয় পরিচয় এবং ভাষার লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।
এয়ার কানাডা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে সেপ্টেম্বর নাগাদ ৬৮ বছর বয়সী রুসো তার দায়িত্ব বুঝিয়ে দেবেন, কিন্তু তার উত্তরসূরিকে অবশ্যই কানাডার এই সংবেদনশীল ভাষাগত ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন :