কখনো কি আপনার এমন মনে হয়েছে যে আপনি মানুষের ভিড়ে থেকেও ভীষণ একা? আপনি হয়তো আপনার ফোনের দিকে তাকিয়ে অপলক অপেক্ষা করছেন কোনো একটি বার্তার জন্য, যেখানে কেউ অন্তত আপনার একটু খোঁজ নেবে।
কিন্তু চারদিকের নীরবতা আপনাকে কেবল এটাই মনে করিয়ে দিচ্ছে যে আপনি হয়তো কারো কাছেই তেমন গুরুত্বপূর্ণ নন। এই যে এক গভীর একাকীত্ব এবং নিজেকে অপ্রয়োজনীয় বা মূল্যহীন মনে করার অনুভূতি, এটি অনেকের ভেতরটাকেই কুরে কুরে খায়।
বিশেষ করে যখন আপনি অন্যের বিপদে সবার আগে ছুটে যান কিন্তু নিজের খারাপ সময়ে পাশে কাউকে খুঁজে পান না, তখন নিজের অস্তিত্ব নিয়েই সন্দেহ তৈরি হয়। তবে উম্মাহ কণ্ঠের আজকের এই আলোচনা সেইসব হৃদয়ের জন্য যারা মানুষের কাছে স্বীকৃতির আশায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। আজ আমরা জানব কেন আমরা নিজেদের মূল্যহীন ভাবি এবং কীভাবে এই মানসিক কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর কাছে নিজের আসল মর্যাদা খুঁজে পাওয়া যায়।
আমরা কেন নিজেদের মূল্যহীন ভাবি তার মূল কারণ হলো আমরা আমাদের আত্মমর্যাদার মাপকাঠি ভুল জায়গায় স্থাপন করেছি। আমরা আমাদের মূল্য খুঁজছি মানুষের চোখে, মানুষের কথায় বা তাদের আচরণে। আমাদের সুখ-শান্তি এবং আত্মসম্মানের রিমোট কন্ট্রোল আমরা অন্যের হাতে তুলে দিয়েছি। ইসলাম আমাদের শেখায় যে মানুষের হাতে আপনার মূল্য নির্ধারণের কোনো ক্ষমতা নেই। আপনার সম্মান সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন যে তিনি আদম সন্তানকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৭০)। এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে যে স্বয়ং মহাবিশ্বের স্রষ্টা আপনাকে সম্মানিত বলে ঘোষণা করেছেন। সুতরাং আপনার সম্মান কোনো মানুষের দেওয়া ঠুনকো বিষয় নয় যে সে চাইলেই তা কেড়ে নিতে পারবে।
মানুষের কাছে গুরুত্ব খোঁজা এক ধরণের মরীচিকার পেছনে ছোটার মতো কারণ মানুষ নিজেই অত্যন্ত দুর্বল এবং পরিবর্তনশীল। কুরআন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বল করে (সূরা আন-নিসা, ৪:২৮)। মানুষের অন্তর প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানিয়েছেন যে মানুষের অন্তর আল্লাহর আঙুলসমূহের মধ্যে রয়েছে এবং তিনি যেভাবে ইচ্ছা তা পরিবর্তন করেন (সহীহ মুসলিম, ২৬৫৪)।
যে মানুষটি আজ আপনার প্রশংসা করছে, কাল সে আপনাকে ভুলেও যেতে পারে। আপনি যখন এমন এক অস্থির সৃষ্টির কাছে নিজের স্থায়ী মূল্যের স্বীকৃতি খুঁজতে যাবেন, তখন হতাশ হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। আপনি আপনার মূল্য খুঁজছেন সৃষ্টির কাছে অথচ স্রষ্টা আপনাকে তাঁর নিজের দিকে ডাকছেন।
আপনার অনুপস্থিতি কারো কাছে গুরুত্বপূর্ণ কি না তা ভাবার সময় একবার নবীদের জীবনের দিকে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। নূহ (আলাইহিস সালাম) প্রায় সাড়ে নয়শ বছর তাঁর জাতিকে দাওয়াত দিয়েছিলেন কিন্তু হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া কেউ তাঁর ডাকে সাড়া দেয়নি। এমনকি তাঁর নিজের পরিবারও তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। সেই সমাজের চোখে তাঁর হয়তো কোনো পার্থিব মূল্য ছিল না কিন্তু আল্লাহর কাছে তিনি ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাসূল।
আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে তাঁর নিজের লোকেরা পাগল ও জাদুকর বলে গালি দিয়েছিল। তারা তাঁকে জন্মভূমি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই অন্ধকার সমাজের কাছে তাঁর মূল্য না থাকলেও আল্লাহর কাছে তিনি ছিলেন সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ মানব এবং হাবীবুল্লাহ। সুতরাং মানুষের প্রত্যাখ্যান আপনার মূল্য কমিয়ে দেয় না যদি আল্লাহ আপনার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।
একজন মুমিনের মর্যাদা আল্লাহর কাছে কতটা বেশি তা নিয়ে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হাদিস রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একবার কা’বা শরীফের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন যে কাবার সম্মান অনেক বেশি হলেও একজন মুমিনের সম্মান আল্লাহর কাছে কাবার চেয়েও অধিক (সুনানে ইবনে মাজাহ, ৩৯৩২)।
এই অভাবনীয় মর্যাদার কথা জানার পর কি নিজেকে আর মূল্যহীন ভাবা উচিত? দুনিয়ার মানুষ হয়তো আপনাকে মিস করে না কিন্তু আপনি কি ভেবে দেখেছেন আপনার অনুপস্থিতি আল্লাহর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ? যখন আপনি ফজরের সালাতে অনুপস্থিত থাকেন তখন ফেরেশতাদের ডায়েরিতে আপনার নাম থাকে না। রাতের শেষ প্রহরে যখন আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে নেমে এসে বান্দাকে ডাকেন কিন্তু আপনি তখন গভীর ঘুমে মগ্ন থাকেন, তখন আপনি স্বয়ং আল্লাহর ডাক মিস করছেন (সহীহ আল-বুখারী, ১১৪৫)।
আপনি ভাবছেন আপনি অপ্রয়োজনীয় অথচ মহাবিশ্বের অধিপতি আপনার ডাক শোনার জন্য প্রতি রাতে অপেক্ষা করেন।আপনার মূল্যের প্রকৃত মাপকাঠি হওয়া উচিত আল্লাহর সাথে আপনার সম্পর্ক। কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক সম্মানিত যে সর্বাধিক আল্লাহভীরু বা মুত্তাকী (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩)। আপনার সম্পদ, সৌন্দর্য বা সামাজিক অবস্থান নয় বরং আপনার তাকওয়াই আপনার আসল পরিচয়। এই হীনম্মন্যতা থেকে মুক্তির জন্য প্রথমত আপনার নির্ভরতার উৎস পরিবর্তন করতে হবে। মানুষের কাছে প্রতিদানের আশা ত্যাগ করে যা করবেন কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করুন।
এতে করে মানুষের অবহেলা আপনাকে আর কষ্ট দিতে পারবে না কারণ আপনার পুরস্কার আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত আছে। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত করতে সালাত এবং কুরআনের সাথে গভীর সংযোগ গড়ে তুলুন। বিশেষ করে তাহাজ্জুদের সিজদায় নিজের সব না বলা কথা আল্লাহকে বলুন। দেখবেন এক অপার্থিব প্রশান্তিতে আপনার হৃদয় ভরে উঠবে। মনে রাখবেন, আপনি আল্লাহর এক অসাধারণ সৃষ্টি এবং তিনি আপনাকে ভালোবেসেই সৃষ্টি করেছেন।

আপনার মতামত লিখুন :