মানুষের জীবন এক বিচিত্র প্রবাহের নাম। কখনো এখানে সাফল্যের জোয়ার আসে, আবার কখনো ব্যর্থতার তপ্ত বালুচরে আমাদের স্বপ্নগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে। যখন সবকিছু আমাদের ইচ্ছামতো চলে, তখন আমরা আনন্দিত হই।
কিন্তু যখনই ভাগ্য আমাদের প্রতিকূলে যায়, তখনই আমাদের মনের ভেতর এক ধরণের অস্থিরতা দানা বাঁধতে শুরু করে। আমরা অভিযোগ করতে চাই, নিজেদের ভাগ্যকে দোষারোপ করি এবং এক গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হই। অথচ এই অস্থিরতার ভিড়ে আমরা একটি মৌলিক সত্য ভুলে যাই যে, এই মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম বালুকণা থেকে শুরু করে বিশাল নক্ষত্রপুঞ্জ—সবই এক মহাজাগতিক পরিকল্পনার অংশ।
এই পরিকল্পনার নামই হলো তাকদীর বা কদর। একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আল্লাহর এই পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের ওপর অবিচল আস্থা রাখা। যখন কোনো ব্যক্তি হৃদয়ের গভীর থেকে বিশ্বাস করতে শেখে যে তার জীবনের প্রতিটি ভালো-মন্দ এবং সুখ-দুঃখ সরাসরি আরশ থেকে নির্ধারিত হয়েছে, তখন তার মনের সব হাহাকার এক প্রশান্তিতে রূপান্তরিত হয়।
আল্লাহর ওপর এই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের নামই হলো ইমান। আমাদের রব আল-ক্বাদীর বা সর্বশক্তিমান হিসেবে পরিচিত। তিনি এমন এক সত্তা যিনি সৃষ্টির শুরুতেই সমস্ত কিছুর ভাগ্য লিখে রেখেছেন। এই উপলব্ধিতে যখন কোনো বান্দা সিক্ত হয়, তখন সে বুঝতে পারে যে যা তার পাওয়ার কথা ছিল তা কখনোই তাকে এড়িয়ে যাবে না, আর যা তাকে এড়িয়ে গেছে তা কখনোই তার পাওয়ার কথা ছিল না। এটি কেবল কোনো দার্শনিক তত্ত্ব নয় বরং এটি একটি আধ্যাত্মিক সুরক্ষা কবজ যা মানুষকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করে।
যখন আমরা ভাবি যে আমাদের করার কিছুই ছিল না এবং সবই আল্লাহর হুকুমে হয়েছে, তখন আমাদের হৃদয় এক ধরণের ভারমুক্ত অনুভব করে। এই ভারমুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু হয় বিশুদ্ধ ইমানের মাধ্যমে। আল্লাহর প্রতিটি ফয়সালাই যে চূড়ান্তভাবে কল্যাণকর, তা বুঝতে পারাই হলো প্রজ্ঞার পরিচায়ক। আমাদের সীমিত বুদ্ধি দিয়ে হয়তো আমরা সাময়িক ক্ষতিটি দেখতে পাই কিন্তু আল্লাহ তাঁর অসীম জ্ঞান দিয়ে আমাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণের বীজ বুনে রাখেন।
ইমানের এই স্তম্ভটি নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আমাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সহীহ মুসলিমের একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে জিবরাঈল (আ.) যখন ইমান সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন, তখন নবী কারীম (সা.) উত্তর দিয়েছিলেন যে, ইমান হলো আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতা, কিতাব, রাসুল এবং শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখার পাশাপাশি ভাগ্যের ভালো-মন্দের প্রতিও পূর্ণ ইমান রাখা।
এখান থেকেই বোঝা যায় যে তাকদীরে বিশ্বাস কেবল একটি ঐচ্ছিক বিষয় নয় বরং এটি ইসলামের অন্যতম মূল ভিত্তি। একজন ব্যক্তি যতোক্ষণ পর্যন্ত তার ভাগ্যের তিক্ত স্বাদকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা পরীক্ষা হিসেবে মেনে নিতে না পারবে, ততোক্ষণ তার ইমান পূর্ণতা পায় না। এই মেনে নেওয়াটা কোনো বাধ্যবাধকতা নয় বরং এটি এক ধরণের গভীর ভালোবাসা ও আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ। একজন প্রেমিক যেমন তার প্রিয়জনের দেওয়া যেকোনো উপহার সাদরে গ্রহণ করে, একজন মুমিনও তার রবের দেওয়া ফয়সালাকে ঠিক সেভাবেই বরণ করে নেয়।
তাকদীরে এই অটল বিশ্বাস অর্জনের একটি প্রধান কৌশল হলো জিকির বা আল্লাহর স্মরণ। জিকির কেবল মুখে কিছু শব্দ উচ্চারণ করা নয় বরং এটি হলো নিজের আত্মাকে মহান রবের সাথে যুক্ত করার একটি মাধ্যম। যখন কোনো বান্দা যিকিরের মাধ্যমে নিজের মনকে আল্লাহর স্মরণে ডুবিয়ে দেয়, তখন দুনিয়ার কোনো বিপর্যয় তাকে আর বিচলিত করতে পারে না। জীবনের প্রতিটি মূহুর্তকে আল্লাহর আমানত হিসেবে দেখা এবং সেই সময়টুকু তাঁর ইবাদতে ব্যয় করাই হলো আসল সাফল্য।
অনেক সময় আমরা আমাদের অতীতের ভুল নিয়ে আফসোস করি অথবা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকি। কিন্তু জিকির আমাদের বর্তমান সময়ে আল্লাহর উপস্থিতিকে অনুভব করতে শেখায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা একা নই; আমাদের প্রতিটি নীরব কান্না এবং না বলা বেদনা আমাদের রব দেখছেন এবং শুনছেন। এই জিকিরের শক্তিতেই একজন মানুষ সিজদায় গিয়ে নিজের নফস বা আমিত্বকে বিসর্জন দিতে পারে। সিজদা হলো তাকদীরের সামনে আত্মসমর্পণের সর্বোচ্চ প্রকাশ। যখন কপাল মাটিতে ঠেকে, তখন অহংকার ধূলিসাৎ হয় এবং হৃদয়ে নেমে আসে আসমানি স্থিরতা।
তবে তাকদীরে বিশ্বাসের অর্থ এই নয় যে আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকব। ইসলাম আমাদের প্রচেষ্টা করার নির্দেশ দেয় এবং চেষ্টার পর ফলের জন্য আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করতে শেখায়। আমাদের দুর্বলতা অনেক সময় আমাদের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করতে চায় কিন্তু তাওবা ও অনুতাপের চোখের জল আমাদের আবারও আল্লাহর রহমতের ছায়ায় ফিরিয়ে আনে। আমরা যখন বুঝতে পারি যে আমাদের প্রতিটি আমল ত্রুটিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ আমাদের প্রতি কতটা ধৈর্যশীল, তখন তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমাদের মাথা নুয়ে আসে
আল্লাহ আমাদের সেইসব বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা কেবল মুখে নয় বরং হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে তাকদীরে বিশ্বাসী। জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত যেন আমাদের জবানে তাঁরই গৌরব উচ্চারিত হয় এবং আমাদের মৃত্যু যেন হয় এক প্রশান্ত হৃদয়ে। আল্লাহর ভালোবাসাই হোক আমাদের জীবনের মূল চালিকাশক্তি, যাতে আমরা দুনিয়ার সমস্ত ক্ষুদ্র চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ মাকাম অর্জনের যোগ্য হতে পারি। প্রকৃত শান্তি কোনো বস্তুগত প্রাপ্তিতে নেই বরং তা রয়েছে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকার মাঝে।

আপনার মতামত লিখুন :