আপনার হৃদয়ের ভেতরে কি ইদানীং এক অদৃশ্য শূন্যতা তৈরি হয়েছে যা কোনো কিছুতেই পূরণ হচ্ছে না? আপনি হয়তো পার্থিব জীবনে সফল, আপনার চারপাশে প্রাচুর্য, খ্যাতি কিংবা ভালোবাসার অভাব নেই তবুও দিনশেষে আপনার মনটা শান্ত হয় না। অনেক সময় দেখা যায় আপনি হাসিমুখে সবার সাথে কথা বলছেন কিন্তু আপনার আত্মাটা ভেতরে গোপনে এক ধরণের হাহাকার করছে। সবকিছু থাকার পরেও কেন যেন কিছুই ভালো লাগে না এমন অনুভূতি বর্তমান সময়ে অনেকেরই নিত্যদিনের সঙ্গী। এই ক্লান্তিটা শুধু শরীরের নয় এবং এই শূন্যতাটা শুধু মনেরও নয় বরং এটি হলো আপনার ঈমানের এক গভীর শূন্যতা। যখন আমরা সেই একমাত্র সত্তা থেকে দূরে সরে যাই যিনি আমাদের অন্তরকে শান্তি দেওয়ার জন্য সৃষ্টি করেছেন তখনই এই ধরণের আধ্যাত্মিক হাহাকার তৈরি হয়। এটি মূলত আপনার রবের পক্ষ থেকে এক নীরব সতর্কতা যা আপনাকে আপনার আসল ঠিকানার কথা মনে করিয়ে দিতে চায়।
আধ্যাত্মিক এই সংকটের মূলে রয়েছে আত্মার খাদ্যের অভাব। আমাদের শরীর যেমন খাদ্য ছাড়া বাঁচতে পারে না তেমনি আপনার আত্মাও আল্লাহর স্মরণ ছাড়া প্রাণহীন হয়ে পড়ে। আমরা যখন আমাদের দেহকে সব ধরণের পার্থিব খাদ্য ও বিনোদন দেই কিন্তু আত্মাকে কোরআন, যিকির বা সালাত থেকে বঞ্চিত করি তখন সেটি তীব্র ক্ষুধা অনুভব করে আর এই ক্ষুধাই হলো সেই তথাকথিত শূন্যতা। আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন কেবল তাঁর ইবাদত করা (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫৬)। যখন আমরা এই মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে দুনিয়াবী যশ বা সম্পদকে জীবনের শেষ কথা মনে করি তখন লক্ষ্য পূরণ হলেও অন্তরের হাহাকার থামে না। এছাড়া হারামের দিকে ঝোঁকা আপনার আত্মাকে বিষাক্ত করে তোলে যা ক্ষণিকের আরাম দিলেও অন্তর থেকে চিরস্থায়ী বরকত ও শান্তি দূর করে দেয়।
এই ভালো না লাগার অসুখটির প্রধান কারণ হলো গাফিলতি বা আধ্যাত্মিক অসচেতনতা। গাফিলতি আপনার এবং আল্লাহর মাঝে এক অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি করে যা আপনাকে রুটিনমাফিক ইবাদতে অভ্যস্ত করলেও তাতে প্রাণের ছোঁয়া থাকে না। যখন অন্তর গাফিলতিতে ডুবে যায় তখন তা ধীরে ধীরে পাথরের মতো কঠিন হয়ে পড়ে (সূরা আল-বাকারা, ২:৭৪)। পাথরের মতো হৃদয় আল্লাহর ওয়াদা বা শাস্তির কথায় সাড়া দেয় না এবং জীবনের আসল সৌন্দর্য দেখতে পায় না। ছোট ছোট পাপগুলো জমা হতে হতে হৃদয়ের ওপর এক ধরণের কালো দাগ তৈরি করে (সুনানে তিরমিযী, ৩৩৩৪)। এই কালো দাগগুলো যখন পুরো হৃদয়কে ঢেকে দেয় তখন মানুষ এক গভীর অন্ধকারে ডুবে যায় আর তখন তার কাছে পৃথিবীর কোনো আনন্দই আর অর্থবহ মনে হয় না।
হৃদয়ের এই শূন্যতা দূর করার একমাত্র নিখুঁত প্রেসক্রিপশন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা দিয়ে রেখেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন যে কেবল আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রকৃত শান্তি লাভ করতে পারে (সূরা আর-রা`দ, ১৩:২৮)। এই প্রশান্তি বা সাকীনাহ কোনো বাহ্যিক বস্তু নয় বরং এটি ভেতর থেকে আসা এক স্বর্গীয় অনুভূতি। যিকির মানে শুধু মুখে তাসবিহ পাঠ করা নয় বরং এটি হলো জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহকে স্মরণে রাখা। জিহ্বার যিকিরের পাশাপাশি হৃদয়ে আল্লাহর ভয় এবং তাঁর প্রতিটি ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকাই হলো প্রকৃত যিকির। আপনার প্রতিটি কাজকে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে করাই হলো আমলের যিকির যা মানুষের জীবনের উদ্দেশ্যকে অর্থবহ করে তোলে।
এই শূন্যতা পূরণের ব্যবহারিক পদক্ষেপ হিসেবে কোরআনকে আপনার রূহের প্রধান খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। প্রতিদিন অন্তত সামান্য অংশ হলেও অর্থসহ কোরআন তিলাওয়াত আপনার রবের সাথে আপনার কথোপকথন শুরু করবে। সালাতকে কেবল একটি প্রথাগত অভ্যাস হিসেবে না দেখে একে আপনার দুনিয়াবী ব্যস্ততার মাঝে পাঁচ মিনিটের শ্রেষ্ঠ বিশ্রাম হিসেবে গ্রহণ করুন। সালাতে মনোযোগ বা খুশু ফিরিয়ে আনা আপনার আত্মাকে প্রশান্ত করবে। বারবার ইস্তেগফার করার মাধ্যমে আপনার অন্তরের জমে থাকা কালো দাগগুলো মুছে ফেলুন। এছাড়া নেক সঙ্গীর সান্নিধ্য এবং আল্লাহর দেওয়া ছোট ছোট নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আপনার জীবনে হারানো সাকীনাহ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে। যখন আপনি আল্লাহর দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাবেন তখন তিনি আপনার হৃদয়ে এমন এক তৃপ্তি দেবেন যা দুনিয়ার কোনো সম্পদ বা ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারবে না।

আপনার মতামত লিখুন :