সামনে নির্বাচন আসছে এবং চারদিকে এরই মধ্যে এক ধরণের কৃত্রিম আমেজ তৈরি হয়েছে যেখানে মানুষের মুখে মুখে শুধু ভোটের আলোচনা শোনা যাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে আমাদের করণীয় কী তা নিয়ে এক গভীর ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনে কাকে ভোট দেব বা কোন দল ভালো—এই সমীকরণ মেলাতে গিয়ে আমরা অনেক সময় আমাদের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ি। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে একজন নব্বই বছর বয়সী বৃদ্ধ তাঁর জীবনে অসংখ্য নির্বাচন দেখেছেন কিন্তু প্রতিবারই নির্বাচনের এক-দুই বছর পর তিনি নির্বাচিতদের গালিগালাজ করছেন।
এটি কেবল কোনো ব্যক্তির অভিজ্ঞতা নয় বরং এটি এদেশের এক নিষ্ঠুর সত্য। গণতন্ত্র মূলত মানুষের এই সাময়িক উত্তেজনা এবং আবেগ নিয়ে খেলা করে যেখানে একটি ভোট দেওয়ার ক্ষমতাকে শিশুর কান্না থামানোর ললিপপের মতো ব্যবহার করা হয় যাতে জনগণ মূল সমস্যাগুলো ভুলে থাকে। মুসলিম উম্মাহকে এখন এই স্বল্পমেয়াদী আবেগের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে।
বাস্তবতা হলো বিগত পনেরো বছর বা তারও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রে কী হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছর কী হবে তা কেবল একটি ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না। ভোট দেওয়ার পরদিনই জনগণ আবার শোষিত ও লাঞ্ছিত হয় কারণ এটি একটি অবিরাম লুপের মতো কাজ করে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে ষোলো কোটি মানুষের ভোটের ক্ষমতার চেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা অনেক বেশি। মিডিয়া, অর্থনীতি এবং জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোই মূলত একটি রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। জনগণ যদি জ্ঞানহীন এবং আবেগসর্বস্ব হয় তবে তাদের কোনো প্রকৃত মূল্য নেই।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আদম আলাইহিস সালামকে ফেরেশতা এবং জিনদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলেন শুধুমাত্র তাঁর বিশেষ জ্ঞানের কারণে (সূরা আল-বাকারা, ২:৩১-৩৩)। বনী ইসরাঈলের নেতা তালুতকে আল্লাহ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁর জ্ঞান এবং শারীরিক সক্ষমতার কারণে। আজ বিশ্ব শাসন করছে পশ্চিমা শক্তিগুলো কারণ তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানকে কুক্ষিগত করে রেখেছে। বিশ্ব মোড়লরা মুসলিমদের আবেগ বা জীবন দেওয়াকে ভয় পায় না বরং তারা ভয় পায় মুসলিমদের জ্ঞান ও সৎ সাহসকে।
আমাদের মানসিকতায় এখনো ব্রিটিশ শাসনের গোলামির স্বভাব রয়ে গেছে যেখানে আমরা মিথ্যা, দুর্নীতি এবং ধোঁকাবাজিতে লিপ্ত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীদের মধ্যে নেতৃত্বের যে গুণাবলি ছিল আমরা তার ধারেকাছেও নেই। সিরাত বা ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখলে দেখা যায় যে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর চরম শত্রুদের নিয়েও কখনো ব্যক্তিগত আক্রমণ বা কটূক্তি করেননি। আজকের গণতন্ত্রের সংস্কৃতি যেখানে মিথ্যা, গীবত এবং পরনিন্দার ওপর দাঁড়িয়ে আছে (সহীহ মুসলিম, ২৫৮৯) সেখানে রাসূলুল্লাহ ﷺ সর্বদা আদর্শিক লড়াই করেছেন।
নেতা কখনো জাতিকে বিভক্ত করেন না কিন্তু গণতন্ত্র জাতিকে টুকরো টুকরো করে ফেলে। হুনাইনের যুদ্ধের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ গনীমতের মাল বিতরণের মাধ্যমে আনসারদের আবেগকে যেভাবে স্পর্শ করেছিলেন তা ছিল প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয় (সহীহ আল-বুখারী, ৪৩৩০)। তিনি তাঁর জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছিলেন যা বর্তমানের বিভক্তির রাজনীতিতে অনুপস্থিত।
আজকের সবচেয়ে বড় সংকট হলো ইমান বিল গায়েব বা অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাস এবং পূর্ণাঙ্গ তাওহীদের অভাব। আমরা মুখে আল্লাহকে সর্বশক্তিমান বললেও অন্তরে আমেরিকা বা ইসরাঈলকে শক্তিশালী মনে করি। অথচ মুসা আলাইহিস সালাম যখন ফেরাউনের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন তখন বাহ্যিক দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল। কিন্তু তাঁর অন্তরে ছিল আল্লাহর ওপর অটল বিশ্বাস। ফেরাউনের জাদুকরদের জাদুর ভেলকি মুসা আলাইহিস সালামের লাঠির অলৌকিক ক্ষমতার সামনে টিকতে পারেনি (সূরা আল-আরাফ, ৭:১১৭-১১৯)।
জাদুকররা বুঝতে পেরেছিল যে এটি কোনো জাদু নয় বরং আল্লাহর ক্ষমতা এবং তারা সাথে সাথে সিজদায় লুটিয়ে পড়েছিল। আমাদের ইমান হতে হবে আসহাবুল উখদুদের মতো যারা আগুনের গর্তে নিক্ষিপ্ত হয়েও ইমান ছাড়েনি (সূরা আল-বুরুজ, ৮৫:৪-৮)। আল্লাহর শক্তির সামনে বর্তমানের পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতা শূন্যের কোঠায়—এই বিশ্বাস ছাড়া উম্মাহর বিজয় অসম্ভব।
পরিশেষে উম্মাহর বিজয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো আল্লাহর সরাসরি সাহায্য যা পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম হলো সালাত বা নামাজ। বদর যুদ্ধের আগের রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ সারারাত সিজদায় পড়ে কেঁদেছেন এবং আল্লাহর সাহায্য চেয়েছেন (সহীহ মুসলিম, ১৭৬৩)। একজন নবী হয়েও তিনি যদি আল্লাহর সাহায্যের জন্য এতটা ব্যাকুল হতে পারেন তবে আমরা সাধারণ উম্মত হয়ে নামাজ ছাড়াই বিজয় আশা করি কীভাবে? সালাত হলো বান্দার সাথে আল্লাহর যোগাযোগের সেই পাসওয়ার্ড যা রহমতের দরজা খুলে দেয়।
আল্লাহ নিজেই বলেছেন ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করতে (সূরা আল-বাকারা, ২:৪৫)। আমরা স্লোগান আর মিছিল দিয়ে ইসলাম কায়েম করতে চাই যা আল্লাহর সাহায্য ছাড়া অসম্ভব। গণতন্ত্রের ধোঁকায় না পড়ে জ্ঞান অর্জন এবং সৎ সাহসের মাধ্যমে আমাদের যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে এবং সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত করতে হবে। তবেই আসবে উম্মাহর কাঙ্ক্ষিত বিজয় এবং মুক্তি।

আপনার মতামত লিখুন :