রাতের গভীর নীরবতায় যখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে আসে তখন অনেকের হৃদয়েই একটি মৌলিক প্রশ্ন জেগে ওঠে যে আমি আসলে কেন এখানে এসেছি। জাগতিক সফলতার চূড়ায় পৌঁছেও অনেক সময় মানুষের অন্তরে এক ধরণের শূন্যতা বা অস্থিরতা কাজ করে যা কোনো দামি গাড়ি বা ব্যাংক ব্যালেন্স দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হয় না। এই অর্থহীনতার বোধ মূলত আমাদের জীবনের প্রকৃত নকশা বা ব্লুপ্রিন্ট ভুলে যাওয়ার ফলাফল। আমরা প্রায়শই ডিগ্রির পেছনে বা পদের পেছনে ছুটতে গিয়ে ভুলে যাই যে আমরা কোন গন্তব্যের যাত্রী। ইসলাম আমাদের শেখায় যে জীবনের উদ্দেশ্য কেবল খাওয়া বা ঘুমানো নয় বরং এটি এক বিশাল পরিকল্পনার অংশ। এই উদ্দেশ্য খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত মানুষের আত্মা কখনোই প্রকৃত সাকীনাহ বা স্থিতিশীলতা খুঁজে পায় না।
আপনার জীবনের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে এক অমোঘ ঘোষণা দিয়েছেন যেখানে বলা হয়েছে যে তিনি জিন এবং মানুষকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫৬)। এটিই হলো মানবজীবনের প্রধান লক্ষ্য। তবে ইবাদত শব্দটিকে কেবল সালাত বা সিয়ামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সঠিক নয় কারণ এটি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সাথে জড়িত। যখন একজন মুমিন তার প্রতিটি কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে করে তখন তার সাধারণ কাজগুলোও ইবাদতে পরিণত হয়। উদাহরণস্বরূপ রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানো যদি ফজরের সালাতে ওঠার নিয়তে হয় তবে সেই ঘুমটুকুও ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের জীবনের প্রতিটি ছোট পদক্ষেপকে অর্থবহ করে তোলে এবং তাকে লক্ষ্যহীনতার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয়।
তবে এই পৃথিবীতে এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা আমাদের এই মহান লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে চায় যাকে কুরআনে ফিতনাহ বা পরীক্ষা বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিকে মানুষের জন্য এক চরম পরীক্ষা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (সূরা আল-আনফাল, ৮:২৮)। পার্থিব মোহ অনেক সময় আমাদের মধ্যে গাফিলতি বা অমনোযোগিতা তৈরি করে যার ফলে আমরা মনে করতে শুরু করি যে আমরা এখানে চিরকাল থাকব। অথচ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের উপদেশ দিয়েছেন দুনিয়াতে একজন মুসাফিরের ন্যায় জীবনযাপন করতে (সহীহ আল-বুখারী, ৬৪১৬)। একজন মুসাফির যেমন পথের ক্লান্তি নয় বরং গন্তব্যের দিকে নজর রাখে তেমনি মুমিনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জান্নাত যা দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী প্রাপ্তির চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।
উদ্দেশ্য পূরণের জন্য প্রথম এবং প্রধান পদক্ষেপ হলো নিয়তের শুদ্ধিকরণ। প্রতিটি কাজের আগে নিজেকে প্রশ্ন করা যে এই কাজটি কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হচ্ছে কি না। এছাড়া পাঁচ ওয়াক্ত সালাত হলো দিনের সেই পাঁচটি চেকপয়েন্ট যা আমাদের বারবার মূল লক্ষ্যের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। দিনের শেষে নিজের কাজের হিসাব নেওয়া এবং অল্পে সন্তুষ্ট থাকার অভ্যাস মানুষকে মানসিক অস্থিরতা থেকে রক্ষা করে। যখন ইবাদত হৃদয়ের মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়ায় তখন দুনিয়ার কোনো হারানো প্রাপ্তি মানুষকে আর বিচলিত করতে পারে না। জীবনের এই প্রকৃত উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়াই হলো সেই পরম আরোগ্য যা মানুষের ভেঙে যাওয়া আত্মাকে পুনরায় জোড়া লাগিয়ে দেয় এবং চিরস্থায়ী প্রশান্তির দ্বারে পৌঁছে দেয়।

আপনার মতামত লিখুন :