গত চৌদ্দশত বছরের সুদীর্ঘ ও সমৃদ্ধ মুসলিম ইতিহাসে নারীদের ভূমিকা আসলে কেমন ছিল তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। অনেকেই মনে করেন তাঁরা কেবল ঘরের কোণে জীবন অতিবাহিত করেছেন কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় সমাজ ও জাতি গঠনে তাঁদের অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। মুসলিম ইতিহাসে নারীরা কেবল স্ত্রী বা মায়ের ভূমিকাই পালন করেননি বরং তাঁরা ছিলেন একেকজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজসংস্কারক এবং রণাঙ্গনের অকুতোভয় যোদ্ধা। তাঁদের জীবনের গল্পগুলো আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি রোমাঞ্চকর এবং ঈমানী দীপ্তে উজ্জ্বল যা জাতি গঠনে তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রমাণ দেয়। ঠিক এমনই এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সন্ধানে আজ আমরা এমন কয়েকজন নারীর জীবনে আলোকপাত করব যাঁদের অবদান স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে কিন্তু সাধারণ পাঠকদের কাছে হয়তো এখনও তা অস্পষ্ট।
এই ইতিহাসের ধারায় প্রথমেই আমরা স্মরণ করতে পারি উম্মুল মুমিনিন জয়নাব বিনতে জাহশ (রা.)-কে যাঁর বিয়ে সংঘটিত হয়েছিল স্বয়ং আরশে আজিমে মহান আল্লাহর সরাসরি ফয়সালায়। মদিনার সমাজে যখন দত্তক প্রথা নিয়ে এক কঠিন সামাজিক অচলায়তন তৈরি হয়েছিল তখন মহান আল্লাহ তায়ালা সেই প্রথা ভেঙে দেওয়ার জন্য ওহী নাজিল করেছিলেন। মানুষের তৈরি করা নিয়ম আর কুসংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আসমান থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে জয়নাব (রা.)-এর বিবাহের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এটি কেবল একটি বিয়ে ছিল না বরং এটি ছিল সমাজ সংস্কারের এক ঐতিহাসিক দলিল। জয়নাব (রা.) গর্ব করে অন্য উম্মুল মুমিনিনদের বলতেন যে তাঁদের বিয়ে দিয়েছেন তাঁদের অভিভাবকরা আর তাঁর বিয়ে দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ সাত আসমানের উপর থেকে যা সহীহ বুখারীর ৭৪২০ নম্বর হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে ইসলামে নারীর মর্যাদা এবং আল্লাহর পরিকল্পনায় তাঁদের অবস্থান কত উঁচুতে ছিল।
এরপর আমাদের নজরে আসে রুফাইদা আল-আসলামিয়া (রা.)-এর নাম যিনি ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের প্রথম স্বীকৃত সেবিকা। মদিনার মসজিদে নববীর আঙিনায় তাবু খাটিয়ে তিনি আহত সাহাবীদের সেবা করতেন এবং খন্দকের যুদ্ধের ভয়াবহ মুহূর্তে রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন আহত সাহাবী সাদ ইবনে মুয়াজকে যেন রুফাইদার তাবুতে রাখা হয়। যুদ্ধের ময়দানে যখন তলোয়ারের ঝনঝনানি তখন একজন নারী হিসেবে রুফাইদা (রা.) মমতাময়ী সেবার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন যা আধুনিক নার্সিংয়ের আদি রূপ হিসেবে স্বীকৃত। এছাড়া রণাঙ্গনে ঢাল হাতে রাসুল (সা.)-এর সুরক্ষায় যিনি ইস্পাতদৃঢ় প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়েছিলেন তিনি হলেন উম্মে উমারা নুসায়বা বিনতে কাব (রা.)। উহুদের যুদ্ধের সেই সংকটময় সময়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন যে তিনি ডানে-বায়ে যেদিকেই তাকাচ্ছিলেন দেখছিলেন নুসায়বা তাঁকে রক্ষা করার জন্য লড়াই করছেন। শরীরের জখম আর রক্তস্রোত যাঁকে দমাতে পারেনি সেই বীরত্বগাঁথা আজও মুমিনের হৃদয়ে সাহসের সঞ্চার করে।
মুসলিম ইতিহাসের এই বিশাল ক্যানভাসে তূমাদির বিনতে আমর বা আল-খলসার নামও বিশেষভাবে উজ্জ্বল যিনি ছিলেন আরবের শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি তাঁর চার পুত্রকে কাদিসিয়ার যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন এবং চারজনই শাহাদাতবরণ করার পর তিনি শোক না করে আল্লাহর প্রশংসা করেছিলেন। এই ধরণের ত্যাগের গল্প ঈমানের এক সর্বোচ্চ শিখরকে নির্দেশ করে। শুধু তাই নয় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও নারীদের এক বিশাল ও বিশ্বস্ত জায়গা ছিল যেখানে তাঁরা বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার প্রমাণ দিয়েছেন। ১৪০০ বছরের এই দীর্ঘ পথচলায় মুসলিম নারীরা যে কেবল সাহাবী বা তাবেঈদের যুগেই সীমাবদ্ধ ছিলেন তা নয় বরং প্রতিটি শতাব্দীতেই এমন মহীয়সী নারীদের জন্ম হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তান উপমহাদেশের ইতিহাসেও এমন অনেক পুণ্যবতী নারীর নাম রয়েছে যাঁরা পারিবারিকভাবে সন্তান গড়ে তোলা এবং স্বামীকে দ্বীনের পথে সহযোগিতা করার মাধ্যমে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে লেখক আরিফুল ইসলামের রচিত ‘পুণ্যবতী’ বইটি ঠিক এমনই এক অনবদ্য সংকলন যেখানে স্থান পেয়েছে মুসলিম ইতিহাসের মোট ৪০ জন মহীয়সী নারীর জীবনের গল্প। দ্বীন পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত এই অসাধারণ বইটিতে সাহাবী এবং তাবেঈ নারীদের গল্পের পাশাপাশি আমাদের এই জনপদের মহীয়সী নারীদের জীবনচরিতও তুলে ধরা হয়েছে। আসমানে বিয়ে হওয়া সেই নারীর গল্প থেকে শুরু করে ইসলামের প্রথম নার্সের সেবা কিংবা বীর যোদ্ধা নারীর বীরত্বগাঁথা এই বইটির পাতায় পাতায় সংরক্ষিত। মাওলানা হাসান শুয়াইবের সম্পাদনায় প্রকাশিত এই বইটি প্রতিটি মুসলিম পরিবারে থাকা প্রয়োজন যাতে আমাদের নারীরা তাঁদের পূর্বসূরীদের সাহসিকতা এবং আল্লাহভীতি সম্পর্কে জানতে পারেন। এই ৪০ জন নারীর জীবনী কেবল কিছু ঘটনার সমষ্টি নয় বরং এটি একটি আয়না যেখানে বর্তমান সমাজ নিজেদের অবস্থাকে যাচাই করতে পারে এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রেরণা সংগ্রহ করতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন :