জীবনের কোনো এক বিশেষ মুহূর্তে হয়তো আপনি জুমুআর দিনে কিংবা রমজানের কোনো এক কান্নাভেজা রাতে ইমাম সাহেবের পেছনে দাঁড়িয়েছেন। আপনি দেখছেন তিনি অত্যন্ত সুন্দর ও ছন্দময় আরবী শব্দে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছেন যার আকুতি আপনার হৃদয়কে স্পর্শ করে যাচ্ছে। সেই মুহূর্তে নিজের দিকে তাকালে হয়তো আপনার এক ধরণের হীনম্মন্যতা কাজ করে। আপনার মনে হয় যে আপনি তো এমন গুছিয়ে বলতে পারেন না অথবা আপনার হয়তো বড় বড় আরবী দোয়াগুলো মুখস্থ নেই। আপনি যখন একাকী আল্লাহর সামনে দাঁড়ান তখন আপনার মুখ দিয়ে কেবল সাধারণ কিছু বাংলা শব্দ বের হয় যেখানে আপনি আপনার কষ্টের কথা বা আপনার চাহিদার কথা খুব সহজভাবে বলেন।
তখন মনে একটি সংশয় জাগা স্বাভাবিক যে আপনার এই অগোছালো ও ভাঙা ভাঙা কথাগুলো কি আদৌ আল্লাহর আরশ পর্যন্ত পৌঁছায়? শয়তান অনেক সময় এই সূক্ষ্ম ফাঁদটি ব্যবহার করে আপনার মনে এই ধারণা গেঁথে দিতে চায় যে ভাষার সৌন্দর্যই হয়তো দোয়া কবুলের প্রধান শর্ত এবং আপনি যেহেতু আরবী জানেন না তাই আপনার দোয়া হয়তো হারিয়ে যাবে।প্রকৃতপক্ষে এই ধারণাটি ইসলামের মৌলিক শিক্ষার পরিপন্থী। আল্লাহ তাআলা আপনার ভাষার মুখাপেক্ষী নন কারণ তিনিই সমস্ত ভাষার স্রষ্টা। তিনি আরবী, বাংলা বা ইংরেজি—সবই সমানভাবে বোঝেন।
শুধু তাই নয় তিনি সেই ভাষাও বোঝেন যা আপনার ঠোঁট পর্যন্ত আসার আগেই হৃদয়ের গভীরে ফিসফাস করে। পবিত্র কুরআনের সূরা ক্বাফের ১৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তার মন তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তাও তিনি জানেন; এমনকি তিনি মানুষের শাহরগের চেয়েও বেশি কাছে অবস্থান করেন। যিনি আপনার অস্তিত্বের এত কাছে এবং যিনি আপনার মনের গহীনের খবর রাখেন তাঁর কাছে মনের ভাব প্রকাশ করতে কোনো অলংকৃত ভাষার প্রয়োজন নেই। তিনি আস-সামী বা সর্বশ্রোতা এবং আল-আলীম বা সর্বজ্ঞ। তিনি আপনার হৃদয়ের ভাঙার শব্দ এবং আপনার নীরবতার প্রতিটি কণা নিখুঁতভাবে শুনতে পান।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়কার একটি ঘটনা আমাদের এই বিষয়ে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা দান করে। সুনানে আবি দাউদে বর্ণিত একটি সহীহ হাদিস অনুযায়ী এক গ্রাম্য ব্যক্তি নবীজীর কাছে এসে স্বীকার করেছিলেন যে তিনি রাসূল বা মুয়ায (রা.)-এর মতো সুন্দর করে গুছিয়ে দোয়া করতে পারেন না। তিনি সালাতে কেবল আল্লাহর কাছে জান্নাত চাইতেন এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ এই সহজ-সরল চাওয়া শুনে বিরক্ত হননি বরং মুচকি হেসে জানিয়েছিলেন যে তাঁরাও মূলত এই দুটি জিনিসের চারপাশেই দোয়ার গুঞ্জন করেন। এই ঘটনাটি আমাদের শেখায় যে আপনি কত অলংকৃত শব্দ ব্যবহার করছেন তা আল্লাহর কাছে বিবেচ্য নয় বরং আপনি কতটা আন্তরিকভাবে তাঁর কাছে চাইছেন সেটিই আসল। ইখলাস বা নিষ্ঠাই হলো দোয়ার প্রাণ যা একটি ছোট বাক্যকেও আরশে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
অনেক সময় আপনার এই গুছিয়ে বলতে না পারাটাই দোয়া কবুলের বড় উসিলা হতে পারে। যখন কোনো মানুষ খুব সুন্দর ছন্দে দোয়া করে তখন সেখানে রিয়া বা লোকদেখানোর মনোভাব চলে আসা সহজ যা দোয়াকে নষ্ট করে দিতে পারে। কিন্তু যখন আপনি নিজেকে অযোগ্য ভেবে ভাঙা হৃদয়ে এলোমেলো কথায় আল্লাহর কাছে হাত পাতেন তখন আপনার অন্তরে এক ধরণের চরম বিনয় বা ইনকিসার কাজ করে। আল্লাহ তাআলা সেইসব বান্দার খুব কাছে থাকেন যাদের অন্তর কেবল তাঁর জন্যই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। আপনার সেই শব্দহীন কান্না এবং অশ্রুসিক্ত সিজদাই হতে পারে আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠতম এবাদত। সহীহ মুসলিমের একটি হাদিস অনুযায়ী বান্দা সিজদারত অবস্থায় আল্লাহর সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয়। সেখানে তিনি কোনো নির্দিষ্ট ভাষার শর্ত দেননি বরং বেশি বেশি দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন। একজন মা যেমন তার অবুঝ সন্তানের বোবা কান্না বোঝেন দয়ালু আল্লাহ তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি দরদ দিয়ে আপনার না বলা কথাগুলো শোনেন।
দোয়া কবুলের পথে আসল বাধা আপনার অগোছালো ভাষা নয় বরং এর কারণগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের সতর্ক করেছেন যে যার খাদ্য, পানীয় এবং পোশাক হারাম উপার্জনের সে যদি ধূলি-ধূসরিত অবস্থায় আকাশের দিকে হাত তুলেও প্রার্থনা করে তবুও তার দোয়া কবুল হওয়া কঠিন। সহীহ মুসলিমের ১০১৫ নম্বর হাদিসে এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। এর পাশাপাশি সুনানে তিরমিযীর একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে যে আল্লাহ কোনো উদাসীন ও অমনোযোগী অন্তরের দোয়া কবুল করেন না। সুতরাং আপনি যদি হালাল উপার্জন করেন এবং দোয়ার সময় আপনার মন আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট থাকে তবে আপনার অগোছালো বাংলা কথাগুলোই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হতে পারে। পরেরবার যখন আপনি দোয়ার জন্য হাত তুলবেন তখন শব্দ নিয়ে চিন্তা না করে আপনার হৃদয়ের সব কষ্ট ও চাওয়াগুলো আপনার রবের কাছে খুলে বলুন ঠিক যেমন কোনো পরম বন্ধুর কাছে বলা হয়।

আপনার মতামত লিখুন :