বর্তমান ২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আজ যুদ্ধের কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের ফলে বাহরাইন, কুয়েত, দুবাই ও কাতারের মতো দেশগুলো এখন ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জনে কাঁপছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকির মুখে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ ব্যবস্থা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মুসলিম উম্মাহর একটি বড় অংশ এই সংঘাতকে ইমাম মাহদীর আলামত হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে সহীহ হাদিসে বর্ণিত শেষ জমানার মহাযুদ্ধ বা মালহামাতুল কুবরার যে বিবরণ পাওয়া যায়, তার সাথে বর্তমান পরিস্থিতির কোনো মিল আছে কি না তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। উম্মাহ কণ্ঠের আজকের এই বিশ্লেষণ কেবল কুরআন ও সহীহ হাদিসের প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির এই অস্থিরতাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবে।
ইমাম মাহদীর আবির্ভাব নিয়ে মুসলিম বিশ্বের আকিদা অত্যন্ত সুদৃঢ় এবং এ বিষয়ে একাধিক সহীহ বর্ণনা বিদ্যমান। সুনান ইবনে মাজাহ’র ৪০৮২ নম্বর হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে ইমাম মাহদীর আবির্ভাবের আগে পূর্ব দিক থেকে কালো পতাকাবাহী একটি দল বের হবে যারা অত্যন্ত শক্তিশালী যুদ্ধ পরিচালনা করবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরানের পূর্ব প্রান্ত বা খোরাসান অঞ্চল থেকে যে প্রতিরোধ গড়ে উঠছে, তাকে অনেকে এই হাদিসের প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখছেন। তবে গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে থাকায় কেউ নিশ্চিতভাবে কোনো সময় নির্ধারণ করতে পারে না। সূরা লুকমানের ৩৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন যে কিয়ামতের জ্ঞান কেবল তাঁর কাছেই সংরক্ষিত। সুতরাং কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা বছর ঘোষণা করা ইসলামি শরীয়তের পরিপন্থী একটি কাজ।
হাদিসে বর্ণিত ইমাম মাহদীর আগমনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক ফিতনা ও রক্তপাত। মুসনাদে আহমাদের ২২৩৮৭ নম্বর হাদিসে পূর্ব দিক থেকে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরির কথা বলা হয়েছে। বর্তমান সময়ে ইরান, ইরাক ও সিরিয়াজুড়ে যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলছে, তাকে আলেমগণ সম্ভাব্য সেই ফিতনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন। এর পাশাপাশি সহীহ মুসলিমের ২৮৯৭ নম্বর হাদিসে ‘রোম’ বাহিনীর আ’মাক বা দাবিক নামক স্থানে অবতরণের কথা উল্লেখ আছে, যা বর্তমান সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। বর্তমানে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সরাসরি মুসলিম ভূমিতে হস্তক্ষেপ এই হাদিসের প্রেক্ষাপটকে আরও জোরালো করেছে। যদিও আলেমগণ সতর্ক করেছেন যে দাবিক অঞ্চলে এখনো সেই বিশেষ মহাযুদ্ধ বা মালহামাতুল কুবরা সংঘটিত হয়নি যা কিয়ামতের নিকটবর্তী আলামত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত হলো ফুরাত বা ফোরাত নদীর তলদেশ থেকে স্বর্ণের পাহাড় উন্মোচন। সহীহ মুসলিমের ২৮৯৪ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে যে এই নদীর পানি শুকিয়ে এমন কিছু প্রকাশ পাবে যার দখল নিতে গিয়ে প্রতি একশজনে নিরানব্বইজন নিহত হবে। বর্তমানে তুরস্ক, সিরিয়া ও ইরাকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এই নদীর গতিপথ ও পানির স্তর নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে অস্থিরতা বিদ্যমান। এর পাশাপাশি সহীহ বুখারীর ৭১১৮ নম্বর হাদিসে হিজাজ বা মদিনার নিকটবর্তী এলাকা থেকে বিশাল আগুন বের হওয়ার কথা বলা হয়েছে। যদিও ১২৫৬ হিজরিতে এমন একটি অগ্নিকাণ্ড মদিনায় দেখা গিয়েছিল, তবে আধুনিক অনেক বিশ্লেষক একে বর্তমান সময়ের বিস্ফোরক বা আধুনিক যুদ্ধের আগুনের সাথে তুলনা করে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন।
তবে বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় মিল পাওয়া যায় মুসলিমদের মধ্যে চরম বিভেদ ও ‘ওয়াহান’ বা দুনিয়ার মোহ তৈরির বর্ণনায়। সুনান আবু দাউদের ৪২৯৭ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে যে অন্যান্য জাতিগুলো মুসলিম উম্মাহর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে ঠিক যেমন ক্ষুধার্ত মানুষ খাবারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ ﷺ এই অবস্থার কারণ হিসেবে মুসলিমদের সংখ্যাগত স্বল্পতাকে দায়ী করেননি বরং তাদের মানসিক দুর্বলতা বা ‘ওয়াহান’কে চিহ্নিত করেছেন। বর্তমান বিশ্বে যখন মুসলিম দেশগুলোতে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি তৈরি হচ্ছে এবং ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গায় লিপ্ত হচ্ছে, তখন এই হাদিসের বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো উপায় থাকে না। তবে মনে রাখতে হবে যে বড় বড় আলামতগুলো অর্থাৎ দাজ্জালের আবির্ভাব বা হযরত ঈসা (আ.)-এর অবতরণের মতো ঘটনাগুলো এখনো ঘটেনি।
একজন সচেতন মুমিন হিসেবে এই উত্তাল সময়ে কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া বা ফিতনা ছড়ানো উচিত নয়। বরং সূরা আলে ইমরানের ২০০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ যে ধৈর্যের শিক্ষা দিয়েছেন তা অনুসরণ করা জরুরি। ফিতনার সময়ে তাওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে নিজেদের ঈমানকে রক্ষা করা এবং ইলম অর্জনে মনোনিবেশ করাই হলো প্রকৃত সমাধান। বর্তমান ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ইমাম মাহদীর আগমনের প্রেক্ষাপট তৈরি করছে কি না তা সময় বলে দেবে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে উম্মাহর এই সংকট কেবল আল্লাহর হুকুম পালনের মাধ্যমেই দূর হতে পারে। সহীহ বুখারীর ৩৬০১ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে যে ফিতনার সময় শান্ত থাকা বা বসে থাকা ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির চেয়ে নিরাপদ। সুতরাং ধৈর্য ও তাকওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর রহমতের প্রতীক্ষা করাই এখন শ্রেষ্ঠ আমল।

আপনার মতামত লিখুন :