বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল, ২০২৬, ১৯ চৈত্র ১৪৩২

মোটিভেশন

বিশ্বাসের সমাধি: বন্ধুর প্রতারণা ও ইউসুফ (আ.)-এর ধৈর্য

উম্মাহ কণ্ঠ এপ্রিল ২, ২০২৬, ০১:১৬ পিএম
বিশ্বাসের সমাধি: বন্ধুর প্রতারণা ও ইউসুফ (আ.)-এর ধৈর্য

বিশ্বাসঘাতকতার যন্ত্রণায় ধৈর্যের মহিমা | ছবি Ai

জীবনের দীর্ঘ এবং বন্ধুর পথে চলতে গিয়ে আমরা সবাই এক ধরণের নির্ভরতার দেয়াল খুঁজি। একটি বিশ্বস্ত কাঁধ এবং একটি নির্ভরতার দুর্গ হিসেবে আমরা গড়ে তুলি বন্ধুত্বকে। আমরা আমাদের জীবনের সব গোপনীয়তা এবং দুর্বলতা সেই বন্ধুর সামনে অবলীলায় মেলে ধরি এই বিশ্বাসে যে, পৃথিবী উল্টে গেলেও সে পাশে থাকবে।

কিন্তু যখন সেই বিশ্বস্ত দুর্গের ভেতর থেকেই আক্রমণ আসে এবং নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষটির হাতেই বিশ্বাসের সমাধি ঘটে, তখন সেই যন্ত্রণা বর্ণনা করার ভাষা থাকে না। পিঠে বিঁধে থাকা ছুরিটি যখন চেনা হাতের হয়, তখন শুধু একটি সম্পর্কই শেষ হয় না, বরং মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাসের ক্ষমতাটাই হারিয়ে যায়।

উম্মাহ কণ্ঠের আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন সেইসব ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের জন্য, যারা বন্ধুত্বের নামে প্রতারিত হয়ে ভাবছেন যে এই পৃথিবীতে আর কাউকে বিশ্বাস করার জায়গা নেই। মূলত এই গভীর একাকীত্ব এবং বিশ্বাসঘাতকতার পরীক্ষা আল্লাহর অনেক প্রিয় বান্দাদেরও দিতে হয়েছে, যা থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।

বিশ্বাসঘাতকতার এই যন্ত্রণা কেন এতো গভীর তা বুঝতে হলে আমাদের মানুষের স্বভাবজাত দুর্বলতা সম্পর্কে জানতে হবে। ইসলাম আমাদের শেখায় যে মানুষের অন্তর অত্যন্ত অস্থির এবং পরিবর্তনশীল। সহীহ মুসলিমের একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে আদম সন্তানের অন্তরসমূহ আল্লাহর আঙ্গুলসমূহের মধ্যে রয়েছে এবং তিনি যেভাবে ইচ্ছা তা পরিবর্তন করেন (সহীহ মুসলিম, ২৬৫৪)।

আজ যে আপনার পরম বন্ধু, কাল সে দুনিয়ার মোহে বা শয়তানের প্ররোচনায় আপনার ঘোর শত্রু হয়ে যেতে পারে। আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হলো আমরা এই পরিবর্তনশীল মানুষের ওপর আমাদের সমস্ত আস্থা ও নির্ভরতা স্থাপন করে ফেলি। অথচ কুরআন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বল করে (সূরা আন-নিসা, ৪:২৮)। ইসলাম আমাদের মানুষের ওপর ভরসা করতে নিষেধ করে না, তবে আমাদের চূড়ান্ত তাওয়াক্কুল বা নির্ভরতা কেবল আল্লাহর ওপর রাখার নির্দেশ দেয়। যখন আপনার ভরসার কেন্দ্রবিন্দু হবেন আল্লাহ, তখন মানুষের বদলে যাওয়া আপনার ভেতরের শান্তিকে কেড়ে নিতে পারবে না।

বিশ্বাসঘাতকতার সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং ধৈর্যশীল উদাহরণ হিসেবে আমরা নবী ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর জীবনের দিকে তাকাতে পারি। তাঁর সাথে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তারা কোনো দূরের শত্রু ছিল না, বরং ছিল তাঁর আপন ভাইয়েরা। ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে তারা তাঁদের ছোট ভাইকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল এবং তাঁকে এক জনশূন্য গভীর কূপে ফেলে দিয়েছিল (সূরা ইউসুফ, ১২:৯)।

একজন বন্ধুর প্রতারণা যদি এতো কষ্টদায়ক হয়, তবে আপন ভাইদের হাতে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার যন্ত্রণা কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা কল্পনা করাও কঠিন। কিন্তু ইউসুফ (আ.)-এর এই গল্প আমাদের শেখায় যে মানুষের ষড়যন্ত্র আল্লাহর অপ্রতিহত পরিকল্পনার সামনে কতখানি তুচ্ছ। আল্লাহ সেই কূপ থেকেই তাঁকে উদ্ধার করে মিশরের রাজপ্রাসাদে পৌঁছে দিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে শাসকের আসনে বসিয়েছিলেন। এটিই প্রমাণ করে যে কেউ আপনার ক্ষতি করতে চাইলেও আল্লাহ যদি আপনার সাথে থাকেন, তবে সেই ক্ষতিই আপনার জন্য কল্যাণের দ্বার খুলে দিতে পারে।

যখন কেউ আপনার বিশ্বাস ভেঙে দেয়, তখন প্রতিশোধ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগা স্বাভাবিক। কিন্তু নবী ইয়াকুব (আলাইহিস সালাম) এবং ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) আমাদের শিখিয়েছেন ‘সবরে জামীল’ বা সুন্দর ধৈর্যের পথ। ইয়াকুব (আ.) যখন তাঁর ছেলেদের মিথ্যা গল্প শুনলেন, তখন তিনি তাদের সাথে বিবাদে না জড়িয়ে নিজের অসহনীয় দুঃখ ও কষ্টের অভিযোগ কেবল আল্লাহর কাছে পেশ করেছিলেন (সূরা ইউসুফ, ১২:৮৬)।

সিজদায় গিয়ে নিজের রবের কাছে কাঁদা এবং মানুষের নামে গীবত বা বদনাম না করে ধৈর্য ধরা একজন মুমিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাঁর কার্যে অপ্রতিহত এবং তিনি অধিকাংশ মানুষের অগোচরেই তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন (সূরা ইউসুফ, ১২:২১)। আপনার বন্ধুটি হয়তো আপনাকে সাময়িকভাবে কূপে ফেলে দিয়েছে, কিন্তু আল্লাহ হয়তো সেই কূপের মধ্য দিয়েই আপনাকে আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ সাফল্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। অনেক সময় বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের এমন সঙ্গ থেকে বাঁচিয়ে দেয় যা আমাদের ঈমানের জন্য ক্ষতিকর হতে পারতো।

এই পরীক্ষার চূড়ান্ত ও কঠিনতম ধাপ হলো ক্ষমা করা। ইউসুফ (আ.) যখন কয়েক বছর পর তাঁর সেই অপরাধী ভাইদের সামনে পেলেন, তখন তিনি প্রতিশোধ না নিয়ে বলেছিলেন যে আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই এবং আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন (সূরা ইউসুফ, ১২:৯২)। ক্ষমা করার অর্থ এই নয় যে যা হয়েছে তা সঠিক ছিল, বরং এর অর্থ হলো নিজের হৃদয়ের শান্তির জন্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রতিশোধের বোঝা নামিয়ে ফেলা।

কুরআন অনুযায়ী যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল, আল্লাহ সেইসব মুহসিনীন বা সৎকর্মপরায়ণদের ভালোবাসেন (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩৪)। সহীহ হাদিসেও উল্লেখ আছে যে ক্ষমা করার মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার সম্মানই বৃদ্ধি করেন (সহীহ মুসলিম, ২৫৮৮)। সুতরাং বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতায় ভেঙে না পড়ে সেটিকে ঈমানের পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আল্লাহর পরিকল্পনার ওপর আস্থা রাখলে তিনি অবশ্যই এর চেয়েও উত্তম কিছু দান করবেন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

মোটিভেশন বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!