বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল, ২০২৬, ১৯ চৈত্র ১৪৩২

মোটিভেশন

টাকা নয় বরং প্রশান্তিই আসল রিযিক—জেনে নিন ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

উম্মাহ কণ্ঠ এপ্রিল ২, ২০২৬, ০২:৫৬ পিএম
টাকা নয় বরং প্রশান্তিই আসল রিযিক—জেনে নিন ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

প্রশান্তিই জীবনের শ্রেষ্ঠ রিযিক/ছবি Ai

বর্তমান যুগে আমরা এমন এক সামাজিক বাস্তবতায় বাস করছি যেখানে মানুষের সফলতা বা ব্যর্থতার একমাত্র মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে তার ব্যাংক ব্যালেন্স। রিযিক শব্দটিকে আমরা কেবল টাকা-পয়সা, গাড়ি বা বাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। যখন আমরা আমাদের চারপাশের মানুষদের বিলাসবহুল জীবন দেখি, তখন নিজেদের মধ্যবিত্ত বা সাধারণ জীবন নিয়ে এক ধরণের হীনম্মন্যতায় ভুগতে শুরু করি। আমাদের মনে প্রায়ই এই প্রশ্ন জাগে যে আমাদের রিযিক বুঝি অন্য সবার চেয়ে অনেক কম। কিন্তু রিযিকের এই সংকীর্ণ সংজ্ঞা আমাদের জীবন থেকে প্রশান্তি কেড়ে নিচ্ছে এবং আমাদের ঠেলে দিচ্ছে এক অন্তহীন হতাশার দিকে। অথচ ইসলাম রিযিককে কেবল পার্থিব মুদ্রার হিসেবে দেখে না বরং এর পরিধি অনেক বেশি বিস্তৃত এবং গভীর। রিযিক হলো এমন সব নিয়ামতের সমষ্টি যা মানুষের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখে এবং তার আত্মাকে প্রশান্তি দান করে।

রিযিককে কেবল অর্থের সাথে তুলনা করার ফলে সমাজে তিনটি বড় ধরণের আধ্যাত্মিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। মানুষ অন্যদের সাথে নিজের বৈষয়িক সম্পদের তুলনা করে দ্রুত হতাশ হয়ে পড়ছে এবং আল্লাহর দেওয়া অসংখ্য বিদ্যমান নিয়ামতকে অগ্রাহ্য করছে যাকে ইসলামি পরিভাষায় ‘কুফরানে নিয়ামত’ বা অকৃতজ্ঞতা বলা হয়। এই মানসিকতার কারণে মানুষের অন্তর কখনো শান্ত হয় না কারণ সে সর্বদা যা তার কাছে নেই তার পেছনে ছুটে বেড়ায়। কুরআনের আয়াত অনুযায়ী রিযিক কেবল আল্লাহর কাছ থেকে তালাশ করতে হবে এবং একই সাথে তাঁর ইবাদত ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। প্রকৃত রিযিক হলো সেটিই যা আপনার মন ও শরীরকে সুস্থ রাখে এবং আপনার আখেরাতের পাথেয় জোগায়। রিযিকের এই ব্যাপকতা বুঝতে না পারলে একজন মানুষ অঢেল সম্পদের মাঝে থেকেও নিজেকে দরিদ্র মনে করতে পারে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হাদিসে সুখী হওয়ার এক অনন্য সূত্র দেওয়া হয়েছে। সুনানে তিরমিযীর একটি বর্ণনা অনুযায়ী তিনি বলেছেন যে যদি কোনো ব্যক্তি নিজ ঘরে নিরাপদ অবস্থায় সকাল করতে পারে, শারীরিকভাবে সুস্থ থাকে এবং তার কাছে সেই দিনের খাবার মজুত থাকে, তবে যেন তাকে পুরো দুনিয়ার সম্পদই দান করা হয়েছে। এই হাদিসটি রিযিকের তিনটি প্রধান স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করে যা হলো নিরাপত্তা, সুস্থতা এবং তাৎক্ষণিক খাদ্যের সংস্থান। আমরা অনেকেই ঘরে নিরাপদে ঘুমাতে পারি কিন্তু ভুলে যাই যে বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষ যুদ্ধের আতঙ্কে রাত কাটায়। আমরা সুস্থ শরীরে হাঁটাচলা করতে পারি অথচ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা কোটিপতি ব্যক্তিটি তার সমস্ত সম্পদ দিয়েও এক মূহুর্তের সুস্থতা কিনতে পারে না। এই নিরাপত্তা ও সুস্থতা কি আপনার জন্য কোটি টাকার বন্ডের চেয়েও মূল্যবান রিযিক নয়?

রিযিকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বারাকাহ বা বরকত। বরকত হলো এমন এক অদৃশ্য নিয়ামত যা পরিমাণে কম হলেও মানুষের জীবনে অভাবনীয় প্রশান্তি বয়ে আনে। অনেকের প্রচুর টাকা থাকলেও তাদের রাতে ঘুমের জন্য ওষুধের ওপর নির্ভর করতে হয় অথচ একজন দিনমজুর নিশ্চিন্তে শান্তিতে ঘুমাতে পারে। এই শান্তিময় ঘুম আল্লাহর দেওয়া এক বিশেষ রিযিক। একইভাবে নিয়মিত ইবাদত করার সুযোগ পাওয়া, নেক সন্তান এবং একজন দ্বীনদার জীবনসঙ্গী লাভ করা রিযিকের অন্তর্ভুক্ত। কুরআনে নেক জীবনসঙ্গীকে চোখের শীতলতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে যা কোনো পার্থিব সম্পদ দিয়ে কেনা সম্ভব নয়। যখন রিযিকের মধ্যে বরকত থাকে তখন অল্প আয়েও একটি পরিবার সুখে থাকতে পারে আর বরকত উঠে গেলে বিলাসিতার মাঝেও অশান্তি দানা বাঁধে।

আধ্যাত্মিক রিযিক হলো রিযিকের সর্বোচ্চ স্তর যা কখনো শেষ হয় না এবং মৃত্যুর পরেও মানুষের সঙ্গী হয়। ঈমান ও হেদায়েত হলো আত্মার সবচেয়ে বড় রিযিক কারণ এই সম্পদ না থাকলে দুনিয়ার সমস্ত টাকা মানুষকে পরকালের ভয়াবহতা থেকে বাঁচাতে পারবে না। উপকারী জ্ঞান বা ইলমে নাফি যা মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে সেটিও একটি চলমান সদকা বা রিযিক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বদা উপকারী জ্ঞানের জন্য দোয়া করতেন। এছাড়া ভালো বন্ধু যারা আপনাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় তারাও আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশাল উপহার। এই আধ্যাত্মিক সম্পদগুলোই মূলত মানুষের চরিত্রকে সুন্দর করে এবং সমাজকে মানবিক করে তোলে।

রিযিকের এই অসীম ভাণ্ডার উপলব্ধি করার একমাত্র চাবিকাঠি হলো শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা। সূরা ইবরাহীমে আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে যদি বান্দা কৃতজ্ঞ হয় তবে তিনি অবশ্যই তার নিয়ামত বাড়িয়ে দেবেন। এই বৃদ্ধি কেবল সংখ্যাগত নয় বরং এটি হলো বরকতের বৃদ্ধি। যখন কোনো ব্যক্তি তার সুস্থতা এবং সামান্য রিযিকের জন্য আলহামদুলিল্লাহ বলতে শেখে তখন আল্লাহ তার অন্তরে সাকীনাহ বা প্রশান্তি ঢেলে দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের শিখিয়েছেন সর্বদা নিজেদের চেয়ে নিম্নমানের বা অল্প রিযিকপ্রাপ্তদের দিকে তাকাতে যাতে আমরা আল্লাহর নিয়ামতকে তুচ্ছ মনে না করি। আজ থেকেই আমাদের রিযিকের মাপকাঠি পাল্টানো জরুরি। টাকা নয় বরং ঈমান, সুস্থতা এবং মনের শান্তি দিয়ে রিযিক মাপতে শিখলে আমাদের জীবন হবে অনেক বেশি সমৃদ্ধ এবং তৃপ্তিদায়ক।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

মোটিভেশন বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!