মানুষের জীবনে এমন কিছু শূন্যতা তৈরি হয় যা পৃথিবীর কোনো পার্থিব সম্পদ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। একটি পরিচিত গলার স্বর যা আর কখনোই শোনা যাবে না অথবা কন্টাক্ট লিস্টে থাকা একটি ফোন নম্বর যেখান থেকে আর কোনোদিন কল আসবে না—এমন বাস্তবতা আমাদের অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দেয়। যে মানুষটি ছিল আপনার জীবনের সুখ-দুঃখের অবিচ্ছেদ্য অংশ কিংবা আশ্রয়ের শেষ ছায়া, তার নিথর দেহটি মাটির নিচে রেখে ফিরে আসার যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করা দুঃসাধ্য। বুকের ভেতরটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যায় এবং প্রতিটি নিঃশ্বাস নেওয়াও কষ্টকর মনে হয়। জীবনের সবচেয়ে কঠিন এই পরীক্ষায় মানুষ প্রায়ই দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং অবচেতন মনে স্রষ্টার প্রতি এক ধরণের অভিমান বা প্রশ্ন তৈরি হয়। ইসলাম এই গভীর মানবিক কষ্টকে কেবল স্বীকারই করে না বরং এই শোকাতুর হৃদয়ের জন্য দিয়েছে এক অনন্য আধ্যাত্মিক আরোগ্য এবং ধৈর্যের সঠিক পথ।
প্রিয়জনকে হারানোর পর বিলাপ করা বা কষ্ট পাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া কারণ ইসলাম কোনো পাথর হৃদয়ের ধর্ম নয়। মানুষের অন্তরে মমতা ও ভালোবাসা থাকা একটি ঐশী গুণ যা আল্লাহ নিজেই দান করেছেন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তিনি ছিলেন মহাবিশ্বের সবচেয়ে ধৈর্যশীল ব্যক্তি এবং আল্লাহর প্রতিটি ফয়সালায় পরম সন্তুষ্ট। কিন্তু তিনিও যখন তাঁর শিশুপুত্র ইব্রাহিমকে হারালেন তখন তাঁর চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়েছিল। সহীহ বুখারীর ১৩০৩ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে সাহাবী আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) নবীজিকে কাঁদতে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে তিনিও কাঁদছেন কি না। উত্তরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জানিয়েছিলেন যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি রহমত বা দয়া। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন যে চক্ষু অশ্রু বিসর্জন দেয় এবং অন্তর ব্যথিত হয় কিন্তু মুমিন তার মুখে এমন কিছু বলে না যা রবকে অসন্তুষ্ট করে। এই ঘটনাটি আমাদের শেখায় যে শোক পালন করা বা কাঁদা ধৈর্যের পরিপন্থী নয় বরং এটি একটি মানবিক বৈশিষ্ট্য।
ইসলামি শরিয়তে ধৈর্য বা সবর বলতে কেবল চুপ থাকাকে বোঝায় না বরং এটি হলো চরম বিপদের মুহূর্তেও আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা রাখা। সবর হলো সেই মানসিক শক্তি যা মানুষকে চিৎকার করে কান্না, বুক চাপড়ানো বা আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা থেকে বিরত রাখে। সহীহ মুসলিমের ৯৩৪ নম্বর হাদিস অনুযায়ী বিলাপ করা বা উচ্চস্বরে শোক প্রকাশ করা জাহেলী যুগের কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। মুমিনের পরিচয় হলো যখন তার ওপর কোনো বিপদ আসে তখন সে আল্লাহর সেই অমোঘ সত্যটি স্মরণ করে যা সূরা বাকারার ১৫৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে। আমরা মূলত আল্লাহর জন্যই এবং তাঁর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে—এই দর্শনটি যখন মানুষের হৃদয়ে গেঁথে যায় তখন হারানোর যন্ত্রণা এক ধরণের আধ্যাত্মিক সমর্পণে রূপান্তরিত হয়। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে যারা এই ধরণের ধৈর্যের পরিচয় দেবে তাদের ওপর রবের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত বর্ষিত হবে এবং তারাই প্রকৃত হেদায়েতপ্রাপ্ত।
বিচ্ছেদের এই কঠিন সময়ে আল্লাহ বান্দাকে কেবল সান্ত্বনা দেন না বরং অবিশ্বাস্য কিছু প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। উম্মে সালামাহ (রা.)-এর জীবন থেকে আমরা এক চমৎকার শিক্ষা পাই। যখন তিনি তাঁর প্রাণপ্রিয় স্বামী আবু সালামাহকে হারালেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শেখানো একটি দোয়া পড়েছিলেন যেখানে আল্লাহর কাছে বিপদের সওয়াব এবং হারানো জিনিসের চেয়ে উত্তম কিছুর প্রার্থনা করা হয়েছিল। সহীহ মুসলিমের ৯১৮ নম্বর হাদিস অনুযায়ী উম্মে সালামাহ (রা.) প্রথমে ভেবেছিলেন আবু সালামাহর চেয়ে উত্তম আর কে হতে পারে কিন্তু তাঁর ইমান ছিল অটল। আল্লাহ তাঁর সেই ধৈর্যের বিনিময়ে তাঁকে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রী হওয়ার গৌরব দান করেছিলেন। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আল্লাহ যখন আমাদের কাছ থেকে ভালো কিছু নিয়ে নেন তখন তিনি মূলত আমাদের শ্রেষ্ঠ কিছু দেওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করেন। একইভাবে যারা তাদের ছোট সন্তানকে হারিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করে তাদের জন্য জান্নাতে ‘বায়তুল হামদ’ বা প্রশংসার ঘর নামক একটি বিশেষ প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়।
প্রিয়জন চলে যাওয়ার পর জীবিতদের দায়িত্ব কেবল শোক পালনে সীমাবদ্ধ নয় বরং মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তির জন্য কাজ করা জরুরি। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে যে মৃত ব্যক্তির সাথে আমাদের সম্পর্ক দোয়ার মাধ্যমে টিকেই থাকে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মৃত ব্যক্তিকে কবরে একজন ডুবন্ত সাহায্যপ্রার্থীর সাথে তুলনা করেছেন যে তার আত্মীয়-স্বজনের দোয়ার জন্য প্রতীক্ষা করে। মুসনাদে আহমাদের বর্ণনা অনুযায়ী জান্নাতে কোনো বান্দার মর্যাদা হঠাৎ বৃদ্ধি পেলে সে অবাক হয়ে কারণ জানতে চায় এবং তখন তাকে জানানো হয় যে তার সন্তানের ক্ষমা প্রার্থনার কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে। এছাড়া মৃত ব্যক্তির নামে ‘সদকায়ে জারিয়া’ বা প্রবাহমান দান করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ। একটি কূপ খনন করা, গাছ লাগানো কিংবা কোনো এতিম শিশুর শিক্ষার দায়িত্ব নেওয়া এমন কাজ যা যতদিন পৃথিবীতে টিকে থাকবে ততদিন কবরে থাকা ব্যক্তির আমলনামায় সওয়াব পৌঁছাতে থাকবে। সহীহ মুসলিমের ১৬৩১ নম্বর হাদিস অনুযায়ী মানুষের মৃত্যুর পর সব আমল বন্ধ হয়ে গেলেও সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং নেক সন্তানের দোয়া জারি থাকে।
প্রিয়জনকে হারানো কোনো শেষ নয় বরং এটি একটি সাময়ীক বিচ্ছেদ মাত্র। মুমিনদের জন্য পরকালে পুনরায় মিলিত হওয়ার এক শাশ্বত প্রতিশ্রুতি রয়েছে জান্নাতে। আমাদের এই শোককে শক্তিতে এবং অশ্রুকে দোয়ায় রূপান্তর করা উচিত। আপনার প্রিয়জন হয়তো আজ আপনার পাশে নেই কিন্তু আপনার প্রতিটি নেক আমল এবং দোয়া তার পরকালীন জীবনকে আলোকিত করতে পারে। আল্লাহর ফয়সালাকে হাসিমুখে গ্রহণ করা এবং হারানো স্বজনের জন্য কল্যাণের পথ তৈরি করাই হলো প্রকৃত ভালোবাসা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই কঠিন পরীক্ষায় ধৈর্য ধরার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের প্রিয়জনদের জান্নাতুল ফেরদাউসের উচ্চ মাকাম দান করুন। এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর বিচ্ছেদ যেন জান্নাতের চিরস্থায়ী মিলনের সোপান হয়ে দাঁড়ায়।

আপনার মতামত লিখুন :