মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার নাম হলো সময়। আজ ২০২৬ সালের এই মূহুর্তে দাঁড়িয়ে আমরা যখন খুব স্বাভাবিকভাবে আগামীকালের পরিকল্পনা সাজাই তখন আমাদের অবচেতন মন প্রায়ই ভুলে যায় যে বর্তমানের এই যে শ্বাসটি আমরা গ্রহণ করছি সেটিই হতে পারে আমাদের জীবনের শেষ সঞ্চয়। বিশেষ করে আমাদের জবান বা কথা বলার শক্তি এমন এক বিশাল আমানত যার প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শব্দ হাশরের ময়দানে আমাদের পক্ষে বা বিপক্ষে অকাট্য সাক্ষ্য হিসেবে দাঁড়াবে। ইসলামি জীবন দর্শনে জবানের নিয়ন্ত্রণকে কেবল একটি নৈতিক গুণ হিসেবে নয় বরং ইমানের পূর্ণতা হিসেবে দেখা হয়। যখন একজন সচেতন মুমিন এই চিরন্তন উপলব্ধিটি হৃদয়ে লালন করে যে তার প্রতিটি কথাই হতে পারে তার জীবনের শেষ উচ্চারণ তখন তার ব্যক্তিগত আচরণ এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় এক অদ্ভুত ও স্বর্গীয় পরিবর্তন আসে। এই চরম সত্যটি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে আমরা যা কিছু বলছি তা কেবল বাতাসের কোনো সাধারণ কম্পন নয় বরং আরশের মালিকের কাছে সংরক্ষিত একটি স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় নথি। প্রতিটি বাক্যের ইখলাস এবং সত্যতা তাই একজন মুমিনের জন্য কেবল লৌকিক নৈতিকতা নয় বরং এটিই তার পরকালীন মুক্তির প্রধান চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়ায়।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনে নিজেকে `আশ-শাহীদ` বা সর্বসাক্ষী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি কেবল আমাদের প্রকাশ্য কাজগুলোই দেখেন না বরং আমাদের জবানের প্রতিটি উচ্চারণের নিখুঁত হিসাব রাখেন। মানুষের জীবন মূলত আলোচনা, বিতর্ক এবং নানা প্রকার সতর্ক-অসতর্ক কথার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয় কিন্তু বিচার দিবসে এই জবানই যখন আমাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে তখন কেবল সেই শব্দগুলোই আমাদের রক্ষা করবে যা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বলা হয়েছিল। অনেক সময় আমরা গুরুত্বহীন ও খেলো আড্ডায় এমন সব কথা বলে ফেলি যা আমাদের আমলনামাকে গুনাহের বোঝায় অপ্রত্যাশিতভাবে ভারী করে তোলে। গীবত, মিথ্যা এবং পরনিন্দার মতো বিধ্বংসী পাপগুলো আমাদের অজান্তেই আমাদের হৃদয়ের ইমানের নূর কেড়ে নেয়। অথচ একজন প্রকৃত মুমিনের প্রতিটি কথা হওয়া উচিত কল্যাণকর নতুবা এ জাতীয় ক্ষেত্রে নীরবতা অবলম্বন করাই সবচেয়ে শ্রেয়। এই অর্থবহ নীরবতাও এক ধরণের শক্তিশালী জিকির যা মানুষকে অনর্থক দুনিয়াবি জটিলতা ও পরকালীন জবাবদিহিতা থেকে দূরে রাখে।
জীবনের শেষ মূহুর্তে মানুষের মুখে যে কথাটি উচ্চারিত হয় সেটিই মূলত তার সারাজীবনের আমলের একটি সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ হাদিস অনুযায়ী যার শেষ কথা হবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ সে নিশ্চিতভাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে যা সুনান আবি দাউদের ৩১১৮ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তবে এই একটি মাত্র বাক্য অন্তিম মূহুর্তে অর্জনের জন্য প্রয়োজন একনিষ্ঠ সারাজীবনের সাধনা। আমরা যদি আমাদের প্রতিদিনের কথোপকথনে আল্লাহকে ভুলে থাকি এবং কেবল দুনিয়াবি মোহে মগ্ন হয়ে তুচ্ছ বিষয়ে তর্কে লিপ্ত হই তবে অন্তিম মূহুর্তে সেই পবিত্র ও শ্রেষ্ঠ বাক্যটি আমাদের জবান দিয়ে বের হওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। তাই প্রতিটি বাক্যকে জীবনের শেষ বাক্য মনে করে ইখলাসপূর্ণ করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যকীয়। এটি একটি মহান আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ যা মানুষকে বিনয়ী করে তোলে এবং তার অন্তরের গভীরে আল্লাহর অকৃত্রিম ভয় বা তাকওয়া সৃষ্টি করে। যখন আপনি নিশ্চিতভাবে জানবেন যে এর পর আর কোনো কথা বলার সুযোগ আপনার নাও থাকতে পারে তখন আপনি কখনোই কাউকে গালি দেবেন না বা কারো মনে সামান্য কষ্ট দিয়ে কোনো কথা বলতে চাইবেন না।
আধ্যাত্মিক আরোগ্য লাভের জন্য জিকির এবং ইস্তেগফার হলো জবানের প্রধান অলঙ্কার যা আত্মাকে প্রশান্ত রাখে। জবানকে সর্বদা আল্লাহর জিকির এবং কুরআনের তিলাওয়াত দ্বারা সিক্ত রাখা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বিশেষ করে `আসতাগফিরুল্লাহ` এবং `লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ`—এই দুটি ছোট অথচ শক্তিশালী বাক্য মুমিনের ঠোঁটে সব সময় লেগে থাকা দরকার। এটি কেবল পরকালীন মুক্তি নিশ্চিত করে না বরং দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনেও মানুষের অন্তরে এক ধরণের গভীর সাকীনাহ বা আসমানি প্রশান্তি দান করে। আমাদের প্রতিটি রাত যেমন আমাদের জীবনের শেষ রাত হতে পারে তেমনি দিনের প্রতিটি কথা বলার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্ক হওয়া জরুরি। অনেক সময় রাগের মাথায় আমরা এমন কিছু কটু কথা বলে ফেলি যার জন্য পরে অনুশোচনা করতে হয় কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন যে মৃত্যুর কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। রাগের মাথায় বলা সেই কটু বাক্যটিই যদি আপনার জীবনের শেষ কথা হয়ে যায় তবে সেই ভয়াবহ দায়ভার বহন করা আপনার জন্য অসম্ভব হবে। তাই ক্রোধ দমনের পাশাপাশি জবানকে দয়া ও সত্যের এক অনন্য বাহন হিসেবে গড়ে তোলা আজ সময়ের দাবি।
পরিশেষে আল্লাহর দরবারে আমাদের অত্যন্ত আকুল মোনাজাত হওয়া উচিত যেন তিনি আমাদের প্রতিটি কথাকে সত্য ও কল্যাণকর বানান। আমাদের জবান যেন গীবত, মিথ্যা এবং নফসের প্ররোচনা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র থাকে। ইমানের সাথে মৃত্যু এবং শেষ মূহুর্তে পবিত্র কালেমা শাহাদাত নসিব হওয়া আল্লাহর এক বিশেষ ও দুর্লভ নেয়ামত। আমরা আমাদের জীবনের সমস্ত ভার আল্লাহর হাতে সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দিতে চাই এবং তাঁরই অসীম তাওফিকের মাধ্যমে পরকালীন পরম নিরাপত্তা লাভ করতে চাই। আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন তাঁর রহমতের সাক্ষ্য দেয় এবং আমাদের জীবনের শেষ কথাটি যেন হয় তাঁরই পবিত্র নাম। এই চূড়ান্ত ও গভীর উপলব্ধির মাধ্যমেই একজন মুমিন তার জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য খুঁজে পায় এবং পরকালীন দীর্ঘ সফরের জন্য নিজেকে যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে পারে। আল্লাহ আমাদের সবার জবানকে নূরানি করে দিন এবং আমাদের জীবনের শেষ কথাটিকে জান্নাতের চাবিকাঠি বানিয়ে দিন।

আপনার মতামত লিখুন :