আয়নায় যখন আপনি নিজেকে দেখেন তখন আসলে কাকে দেখতে পান? আল্লাহর একজন নগণ্য এবং দুর্বল বান্দাকে নাকি আপনার ভেতরে কোথাও খুব গোপনে একটি সূক্ষ্ম শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি জেগে ওঠে? যখন আপনি আপনার সাফল্য, জ্ঞান, ইবাদত বা প্রতিভার দিকে তাকান তখন কি আপনার মনে হয় যে আপনি অন্যদের চেয়ে আলাদা বা আপনি নিজে এটি অর্জন করেছেন? এই যে নিজেকে বড় ভাবা এবং অন্যকে ছোট মনে করা অথবা সত্যকে গ্রহণ করতে দ্বিধা করা—এই সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোই হলো অহংকার বা কিবর। আপনি কি জানেন যে এই সামান্য অহংকারই ছিল সেই প্রথম পাপ যা আসমানে আল্লাহর অবাধ্যতার জন্ম দিয়েছিল এবং যা আপনার জান্নাতের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে?
অহংকার শুধু নিজেকে বড় মনে করা নয় বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অহংকারের একটি নিখুঁত এবং ভয়ংকর সংজ্ঞা দিয়েছেন। সহীহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি বলেছেন যে অহংকার হলো সত্যকে দম্ভভরে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা। এখানে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। প্রথমত সত্য যখন আপনার সামনে আসে তখন তা জেনে-বুঝে শুধুমাত্র নিজের দম্ভের বশে প্রত্যাখ্যান করা। হতে পারে কেউ আপনাকে কোরআন বা হাদীসের আলোকে কোনো নসিহত করল কিন্তু আপনি ভাবলেন যে সে আপনাকে শেখানোর কে? অথবা আপনি নিজের ভুল বুঝতে পারার পরও তা স্বীকার করলেন না কারণ তাতে আপনার তথাকথিত সম্মানহানি হবে বলে মনে করছেন। দ্বিতীয়ত মানুষকে ছোট মনে করা বা তুচ্ছজ্ঞান করা। হতে পারে সেটা তার দারিদ্র্য, বংশমর্যাদা, জ্ঞানের স্বল্পতা বা গায়ের রঙের কারণে। আপনি যখন নিজেকে কারো চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাবেন এবং তাকে অবজ্ঞার চোখে দেখেন তখনই আপনি অহংকারে লিপ্ত হন।
এই অহংকারের পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি সতর্কবার্তা থেকে স্পষ্ট হয়। তিনি বলেছেন যে যার অন্তরে কণা পরিমাণও অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। একটি অণু পরিমাণ অহংকারও যদি আপনার অন্তরে লুকিয়ে থাকে তবে তা আপনার জান্নাতে প্রবেশের পথে প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবে। অহংকারকে কেন এত মারাত্মক পাপ বলা হয় তার উত্তর পাওয়া যায় একটি হাদীসে কুদসীতে। সেখানে আল্লাহ তাআলা বলেন যে মর্যাদা হলো তাঁর লুঙ্গি এবং অহংকার বা বড়ত্ব হলো তাঁর চাদর। সুতরাং যে ব্যক্তি এ দুটির কোনো একটি নিয়ে আল্লাহর সাথে টানাটানি করবে আল্লাহ তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। অহংকার এবং শ্রেষ্ঠত্ব এগুলো একমাত্র আল্লাহরই বৈশিষ্ট্য। যখন কোনো সৃষ্টি নিজেকে বড় মনে করে তখন সে যেন আল্লাহর অধিকারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে যা এক ধরনের সূক্ষ্ম শিরক।
অহংকার মানুষকে সত্য গ্রহণ করতে বাধা দেয় এবং হেদায়েতের আলো তার অন্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে দেয় না। ফেরাউন ও তার সভাসদরা সত্যকে চিনতে পারার পরও শুধু অহংকার ও দাম্ভিকতার বশেই তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। এই অহংকারই ছিল ইবলিসের পতনের মূল কারণ। আল্লাহ যখন আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করে ফেরেশতাদের সিজদা করার আদেশ দিলেন তখন সবাই সিজদা করলেও ইবলিস তা করেনি। সে যুক্তি দিয়েছিল যে সে আদমের চেয়ে উত্তম কারণ তাকে আগুন থেকে এবং আদমকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। সে আল্লাহকে অস্বীকার করেনি বরং সে ইবাদতকারী ছিল কিন্তু তার একটি মাত্র পাপ ছিল অহংকার। আমি উত্তম—এই একটি বাক্যই তাকে আল্লাহর রহমত থেকে চিরতরে বিতাড়িত করে দিল এবং তাকে অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত করল। যে অহংকার ইবলিসের মতো ইবাদতকারীকে ধ্বংস করে দিতে পারে তা আপনার বা আমার জন্য কী ভয়ংকর হতে পারে তা ভাবার বিষয়।
এই ধ্বংসাত্মক রোগ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো বিনয় বা তাওয়াদু অর্জন করা। বিনয় মানে দুর্বলতা নয় বরং বিনয় মানে নিজের আসল অবস্থানটা জানা এবং আল্লাহর সৃষ্টির সামনে সেই অনুযায়ী আচরণ করা। বিনয়ী ব্যক্তি জানে যে সে আল্লাহর একজন ক্ষুদ্র সৃষ্টি এবং তার যা কিছু আছে সবই আল্লাহর দান। এতে তার নিজের কোনো ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নেই। তাই সে কখনো নিজেকে বড় ভাবে না এবং অন্যকেও ছোট মনে করে না। সে সত্যকে সহজেই গ্রহণ করে এবং নিজের ভুল স্বীকার করতে লজ্জা পায় না। আর রহমানের বান্দা তারাই যারা জমিনে নম্রভাবে চলাফেরা করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন বিনয়ের মূর্ত প্রতীক যিনি নিজে বাজার করতেন এবং নিজের জুতা সেলাই করতেন। আল্লাহর জন্য যে ব্যক্তি বিনয়ী হয় আল্লাহ তার মর্যাদা আরও বাড়িয়ে দেন। আমাদের উচিত নিজের সৃষ্টি ও পরিণতির কথা স্মরণ করা কারণ এক ফোঁটা তুচ্ছ পানি থেকে আমাদের শুরু এবং মাটির নিচেই আমাদের শেষ।

আপনার মতামত লিখুন :