মানুষের এই নশ্বর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আসলে একটি দীর্ঘ সফরের অংশ। এই সফরের শেষ গন্তব্য কোথায় তা নিয়ে ভাবনার অবকাশ বর্তমান ২০২৬ সালের এই উত্তাল সময়েও ফুরিয়ে যায়নি বরং বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা যত বাড়ছে মানুষের আত্মা তত বেশি এক নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছে। পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় সেই নিরাপদ ও সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ আশ্রয়ের নাম হলো ইল্লিয়্যিন। সূরা আল-মুতাফ্ফিফীনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে নেককার বা পুণ্যবানদের আমলনামা ইল্লিয়্যিনে সংরক্ষিত রয়েছে।
এটি কেবল একটি স্থানের নাম নয় বরং এটি হলো এমন এক উচ্চ মর্যাদা যা সরাসরি আল্লাহর আরশ ও নৈকট্যের সাথে সম্পর্কিত। একজন মুমিনের জীবনের চূড়ান্ত সার্থকতা হলো তার আত্মাকে এই ইল্লিয়্যিনে পৌঁছে দেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করা। তবে এই উচ্চ স্তরে পৌঁছানোর পথটি খুব একটা সহজ নয় কারণ আমাদের প্রতিদিনের জীবন চলে গুনাহ, গাফিলতি ও পার্থিব মোহের এক গোলকধাঁধার মধ্য দিয়ে। আমরা প্রায়শই ভুলে যাই যে আমাদের প্রতিটি কাজ এবং চিন্তার একটি পরকালীন ছাপ রয়েছে। ইল্লিয়্যিন হলো সেই সুনির্দিষ্ট কিতাব বা স্থানের নাম যেখানে পাপমুক্ত ও বিশুদ্ধ আত্মার বিবরণ লেখা থাকে এবং এই উচ্চ মর্যাদার জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন ইখলাস বা আন্তরিকতা।
যখন একজন বান্দা তার জীবনের প্রতিটি কাজ কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করে তখনই তার আত্মার সফর এই পবিত্র স্তরের দিকে ধাবিত হতে শুরু করে। আমাদের লজ্জিত হওয়ার কারণ অনেক কারণ আমরা ছোট ছোট স্বার্থের বিনিময়ে অনেক সময় আমাদের আত্মার পবিত্রতাকে জলাঞ্জলি দেই তাই ইল্লিয়্যিন লাভের প্রথম ধাপ হলো গভীর অনুশোচনা বা তওবা।
আধ্যাত্মিক আরোগ্য লাভের জন্য জিকির ও সিজদা হলো সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। আপনি যখন আল্লাহর নাম আর-রাফি বা মর্যাদা উন্নীতকারী বলে ডাকেন তখন আপনার হৃদয়ে এক ধরণের আধ্যাত্মিক স্থিরতা নেমে আসে। জিকির কেবল মুখে কিছু শব্দ উচ্চারণ করা নয় বরং এটি হলো আত্মার সেই খাদ্য যা ইল্লিয়্যিনের পথে পাথেয় হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে সিজদার মুহূর্তটি হলো আল্লাহর সাথে বান্দার সরাসরি আলাপের ক্ষণ যেখানে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে যখন কোনো বান্দা তার ক্ষুদ্রতা স্বীকার করে এবং তার রবের মহত্ত্ব ঘোষণা করে তখন মূলত তার আত্মার মর্যাদা আসমানে উন্নীত হতে থাকে। এই আত্মসমর্পণই হলো সেই চাবিকাঠি যা জান্নাতুল ফিরদাউসের দরজা খুলে দেয়। আমাদের জীবনের শেষ মুহূর্তটি কেমন হবে তা নিয়েই আমাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হওয়া উচিত কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বদা আল্লাহর কাছে জান্নাতুল ফিরদাউস চাইতেন এবং মুমিনদেরও তা চাইতে উৎসাহিত করেছেন। ইল্লিয়্যিন হলো সেই উচ্চ স্তরের একটি অংশ যেখানে পুণ্যবানরা তাদের রবের দীদার বা দর্শন লাভ করবেন।
আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন আল্লাহর জিকিরে সিক্ত থাকে এবং আমাদের মৃত্যু যেন হয় ইমানের সাথে। পরকালে নিজের পরিবারের সাথে জান্নাতে মিলিত হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা তা আমাদের আমলকে আরও বেশি প্রাণবন্ত করে তোলে। পরিশেষে ইল্লিয়্যিন হলো সেই ঠিকানা যা লাভ করলে দুনিয়ার সব ব্যর্থতা ও কষ্ট তুচ্ছ মনে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হওয়ার তাওফিক দান করুন।
হৃদয়ের এই আধ্যাত্মিক আরোগ্য তখনই সম্ভব যখন একজন মানুষ তার নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। বর্তমান সময়ের যান্ত্রিকতা আমাদের আত্মাকে মৃতপ্রায় করে ফেলেছে এবং আমরা প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় যতটা উন্নত হয়েছি আধ্যাত্মিকতায় ততটাই পিছিয়ে গিয়েছি বলে অনেক সময় মনে হয়। ইল্লিয়্যিন অর্জনের জন্য প্রয়োজন ক্বলবে সালীম বা একটি নিরাপদ হৃদয় যা কোনো হিংসা বা বিদ্বেষ ছাড়াই কেবল আল্লাহর প্রতি ভালোবাসায় পূর্ণ থাকে। সাহাবীগণের জীবন থেকে আমরা দেখতে পাই তারা কীভাবে প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুর কথা স্মরণ করতেন এবং পরকালীন পাথেয় সংগ্রহের জন্য ব্যস্ত থাকতেন। সহীহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী ইমানের অন্যতম ভিত্তি হলো ভাগ্যের ভালো-মন্দের ওপর বিশ্বাস রাখা। যখন কোনো মুমিন তার জীবনের কঠিন বিপদকেও আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত হিসেবে গ্রহণ করতে পারে তখনই তার আত্মার স্তর উন্নত হতে থাকে। আমাদের উচিত প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝে কিছু সময় সিজদায় এবং জিকিরে ব্যয় করা যাতে আমাদের আমলনামা ইল্লিয়্যিনে লিপিবদ্ধ হওয়ার যোগ্য হয়। মৃত্যুর পর কবরের অন্ধকার যখন আমাদের গ্রাস করবে তখন কেবল এই জিকিরের নূর আমাদের সাথী হবে। হাশরের ময়দানে যখন সূর্যের প্রখরতা সব সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যাবে তখন ইল্লিয়্যিন-প্রাপ্ত আত্মারা আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় পাবে। এই গৌরবময় গন্তব্যের দিকে আমাদের প্রতিটি কদম বাড়ানো উচিত। আমাদের গুনাহগুলো ঝরিয়ে দিয়ে আল্লাহর রহমতের মহাসাগরে অবগাহন করাই হলো মুক্তির একমাত্র পথ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তওবা কবুল করুন এবং আমাদের আত্মাকে ইল্লিয়্যিনের উচ্চ মর্যাদায় আসীন করুন।

আপনার মতামত লিখুন :