যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ভয়াবহ হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে প্রতিশোধের এক তীব্র ও রক্তক্ষয়ী দাবানল জ্বলে উঠেছে। রাতের অন্ধকারকে চিরে দিয়ে ছুটে যাচ্ছে একের পর এক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, আর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে সুবিশাল শহরের আকাশসীমা। আধুনিক বিশ্ব রাজনীতির এই উত্তাল ও সংঘাতময় পরিস্থিতিতে পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার অহংকার এবং অস্ত্রের ঝনঝনানি সমগ্র অঞ্চলকে এক ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করছে।
ক্ষমতার এই নির্মম দ্বন্দ্বে ইরান যখন তার প্রতিশোধমূলক হামলার নিশানা স্থির করে, তখন কেবল একটি বা দুটি নয়, বরং তেল আবিব থেকে শুরু করে আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব এবং জর্ডানসহ মোট আটটি দেশের মাটিতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে একযোগে ভয়াবহ আক্রমণ পরিচালনা করে। এই তীব্র এবং সুপরিকল্পিত হামলায় ইসরাইলের অভ্যন্তরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়, যেখানে অন্তত নয়জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি শতাধিক মানুষ গুরুতরভাবে আহত হয় এবং তাদের আর্তনাদে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
শুধু ইসরাইল নয়, এই প্রতিশোধের আগুনে প্রাণ হারায় তিন মার্কিন সেনাসদস্যও। যদিও তাদের মৃত্যুর সঠিক স্থান ও ধরন সম্পর্কে মার্কিন প্রশাসন গভীর গোপনীয়তা বজায় রেখেছে, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে দুনিয়ার কোনো পরাশক্তিই মৃত্যুর অমোঘ বিধান থেকে নিজেদের আড়াল করতে পারে না।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, "তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, এমনকি সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করলেও" (সূরা আন-নিসা, ৪:৭৮)। এই আয়াতের বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই মধ্যপ্রাচ্যের এই সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটিগুলোর পতনের মধ্য দিয়ে, যেখানে অত্যাধুনিক রাডার আর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ধ্বংসযজ্ঞ এড়ানো সম্ভব হয়নি।
এই প্রতিশোধের দাবানল মূলত জ্বলে উঠেছিল যুক্তরাষ্ট্রের ও ইসরাইলের সেই ভয়াবহ হামলার পর, যেখানে ইরানের অভ্যন্তরে চালানো নির্মম আগ্রাসনে দুই শতাধিক সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল এবং সাতশোরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় ছটফট করছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছিল ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে, যেখানে শিক্ষার আলো নিতে আসা ১৮০ জন নিষ্পাপ ও মাসুম শিশু শিক্ষার্থীকে বোমার আঘাতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
ধসে পড়া স্কুল ভবনের নিচে চাপা পড়া সেই নিষ্পাপ শিশুদের নিথর দেহ যখন উদ্ধারকর্মীরা বের করে আনছিলেন, তখন চারপাশের বাতাস স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছিল, যা মানব সভ্যতার ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ইসলামে একটি নিরীহ প্রাণ হরণের অপরাধ কত ভয়াবহ, তা মহান আল্লাহ তাঁর পবিত্র কালামে দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, "যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোনো মানুষকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল; আর যে কারও জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল" (সূরা আল-মায়েদাহ, ৫:৩২)।
অথচ আজ ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে আধুনিক বিশ্ব এই ঐশী বাণীকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিরীহ শিশুদের রক্তে নিজেদের হাত রঞ্জিত করছে। ইরানের রাজধানী তেহরানেও এই শোকের ছায়া দীর্ঘায়িত হয়েছে, বিশেষ করে নিলুফার স্কয়ারে সংঘটিত নতুন এক হামলায় যেখানে অন্তত ২০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং চারপাশের রাস্তাঘাট ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
এই ধ্বংসের ঢেউ শুধু ইরান আর ইসরাইলের সীমানাতেই আটকে থাকেনি, বরং তা আছড়ে পড়েছে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও। ইরাকের ইরবিল শহর এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ইরানের পাল্টা হামলায় অন্তত দুজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছে। উপসাগরীয় রাষ্ট্র কাতারের আকাশসীমায় যেন কিয়ামতের এক ক্ষুদ্র দৃশ্য নেমে এসেছিল, যখন ইরানের ছোড়া ৬৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১২টি ড্রোন রাতের আঁধার ভেদ করে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। এর ফলে সেখানে অন্তত ১৬ জন আহত হয় এবং চারপাশের সুউচ্চ ভবনগুলো ভয়ে কেঁপে ওঠে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো ঐশ্বর্যশালী এবং বিলাসবহুল দেশেও এই ধ্বংসযজ্ঞের আঁচ লেগেছে প্রবলভাবে, যেখানে দুবাই এবং আবুধাবির মতো আধুনিক শহরগুলোতে আকস্মিক হামলায় তিনজন প্রাণ হারিয়েছে এবং অর্ধশতাধিক মানুষ গুরুতর জখম হয়েছে। দুবাইয়ের একটি অত্যন্ত অভিজাত ও বিলাসবহুল হোটেল এই হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে মানুষের তৈরি এই বিলাসী ও চাকচিক্যময় পৃথিবী কতটা ক্ষণস্থায়ী ও ভঙ্গুর।
অহংকার আর সম্পদের পাহাড় মানুষের পতন ঠেকাতে পারে না, যা পবিত্র কোরআনে বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, "পার্থিব জীবন তো কেবল ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়" (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫)। বাহরাইনের রাজধানী মানামায় অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর ঘাঁটিতেও এই আক্রমণের ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়েছে এবং কুয়েতের মাটিতেও এই সংঘাতের রেশ এসে পড়েছে, যেখানে হামলায় একজন নিহত এবং অন্তত ৩২ জন আহত হয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে মৃত্যুর সাথে লড়ছে।
চারিদিকে এই যে ধ্বংস, মৃত্যু আর হাহাকারের দৃশ্য, তা মূলত মানবসৃষ্ট ক্ষমতার অহংকার আর জুলুমের এক অনিবার্য পরিণতি। যখন শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সশব্দে আকাশ চিরে নেমে আসে, তখন মানুষের হৃদয়ে যে ভীতির সঞ্চার হয়, তা আমাদের কিয়ামতের সেই ভয়াবহ দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদেরকে সর্বদা ফিতনা এবং ফাসাদের সময় ধৈর্য ধারণ করতে এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে শিখিয়েছেন।
আনাস ইবনে মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত একটি সহীহ হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "তোমরা একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না, একে অপরের প্রতি হিংসা করো না, একে অপরের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না; বরং তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে যাও" (সহীহ আল-বুখারী, ৬০৬৫)। কিন্তু আজ ক্ষমতার লালসায় এবং ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের এক উন্মত্ত প্রতিযোগিতায় মানুষ এই ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবতার শিক্ষাকে ভুলে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো তার ঈমান ও ধৈর্য। মক্কা বিজয়ের ইতিহাস থেকে শুরু করে বদর ও খন্দকের প্রান্তরে আমরা দেখেছি কীভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁর নিজস্ব পরিকল্পনায় অহংকারী ও দাম্ভিকদের পতন ঘটিয়েছেন। মিনাবের বালিকা বিদ্যালয়ের সেই ১৮০ জন শিশুর ঝরে যাওয়া প্রাণ কখনো বৃথা যেতে পারে না। এই চরম অস্থিরতা ও ফিতনার যুগে আমাদের উচিত নিজেদের ঈমানকে আরও সুদৃঢ় করা এবং দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী মোহ থেকে নিজেদের অন্তরকে মুক্ত করা। এই মৃত্যু ও ধ্বংসের খবরগুলো আমাদের জন্য একেকটি জীবন্ত সতর্কবার্তা, যাতে আমরা আমাদের রবের দিকে ফিরে আসি।

আপনার মতামত লিখুন :