সোমবার, ০২ মার্চ, ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সংকেত?

উম্মাহ কণ্ঠ মার্চ ২, ২০২৬, ০২:৩৬ এএম
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সংকেত?

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের উত্তাপ | ছবি Ai

বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত উত্তেজনাকর পরিস্থিতি এবং ইরান-ইসরায়েল সংঘাত কেবল কোনো সাধারণ যুদ্ধ বা নিছক সীমান্ত বিরোধ ও ভূখণ্ড দখলের লড়াই নয় বরং এটি একটি সুদীর্ঘ এবং বহুমুখী লড়াই যা সমগ্র বিশ্বের রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। যখন ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় হামলার পর ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করে ড্রোন এবং হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে তেল আবিব ও হাইফার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইসরায়েলি শহরগুলোতে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে তখন সারা বিশ্ব এক অজানা আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। 

বাহরাইন থেকে কুয়েত এবং দুবাই থেকে কাতার পর্যন্ত এই ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে গোটা অঞ্চল কাঁপছে এবং পারস্য উপসাগরের প্রাণকেন্দ্র হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকিতে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ইসলামী ইতিহাস এবং সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতির এমন গভীর বিশ্লেষণ নিয়মিত পেতে আপনারা ভিজিট করতে পারেন উম্মাহ কণ্ঠের দাপ্তরিক ওয়েবসাইট যা নির্ভরযোগ্য তথ্যের এক অনন্য উৎস হিসেবে কাজ করছে।

এই সংঘাতের বিশাল ও জটিল প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে ইরান এবং ইসরায়েল উভয়েরই মূল লক্ষ্য হলো সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করা। এখানে বিষয়টি স্পষ্ট যে ইরান একটি শিয়া ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র এবং ইসরায়েল একটি ইহুদি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাতে চায়। ইরানের নিজস্ব রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য তারা ইয়েমেনের হুতি এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো প্রক্সি মিলিশিয়াদের ব্যবহার করে আসছে যা অনেক ক্ষেত্রে সুন্নি প্রধান অঞ্চলে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণ হয়েছে। ঠিক তেমনি ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্বও তাদের আধিপত্যের পথে কোনো মুসলিম রাষ্ট্রকে বাধা হিসেবে দেখতে চায় না এবং তারা অত্যন্ত সুকৌশলে মুসলিম বিশ্বকে দুর্বল করার বিভিন্ন প্রক্রিয়া চালু রেখেছে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে যখনই কোনো মুসলিম রাষ্ট্র প্রযুক্তিগত বা সামরিক দিক দিয়ে শক্তিশালী হওয়ার চেষ্টা করেছে তখনই পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো নানা অজুহাতে সেখানে আগ্রাসন চালিয়েছে। ২০০৩ সালে ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মিথ্যা অজুহাত তুলে হামলা চালিয়ে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং ২০১১ সালে লিবিয়াতে ন্যাটোর সরাসরি হস্তক্ষেপে মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে হত্যা করার ঘটনাগুলো এর বড় উদাহরণ। পশ্চিমা বিশ্বের নীতিই হলো কোনো মুসলিম রাষ্ট্র যেন কখনোই সেমিকন্ডাক্টর বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে না পারে। অন্যদিকে ইসরায়েল তাদের প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপ নিজেদের বিকৃত ধর্মগ্রন্থের দোহাই দিয়ে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা গাজায় নিরীহ মানুষের ওপর হামলার সময় বাইবেলের উদ্ধৃতি দেয় এবং তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নাম রাখে ডেভিডস স্লিং যা হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের ঐতিহাসিক গুলতির নামের সাথে সম্পর্কিত।

আজকের মুসলিম উম্মাহ একদিকে যেমন জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে আছে অন্যদিকে তারা ঈমান ও আকিদাকেও বিসর্জন দিয়ে পশ্চিমা সংস্কৃতির দাসে পরিণত হয়েছে। যুবসমাজ আজ মূল্যবান সময় ইন্টারনেটে অপচয় করছে অথচ বিরোধী পক্ষ জ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে দিনরাত পরিশ্রম করছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রকৃত বিজয়ের পথ কোনটি তা বুঝতে আমাদের ফিরে যেতে হবে পবিত্র কুরআনের আসহাবুল উখদুদ বা গর্তওয়ালাদের সেই চিরস্মরণীয় ঘটনায়। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন ধ্বংস হয়েছিল গর্তওয়ালারা ইন্ধনপূর্ণ আগুনের গর্তওয়ালারা যখন তারা তার পাশে উপবিষ্ট ছিল এবং তারা মুমিনদের সাথে যা করছিল তা তারা প্রত্যক্ষ করছিল (সূরা আল-বুরূজ, ৮৫:৪-৭)। সহীহ মুসলিমের একটি দীর্ঘ হাদিসে এসেছে প্রাচীনকালে এক অহংকারী জালিম বাদশাহর দরবারে একজন বালক তাওহীদের জ্ঞান লাভ করে মহান আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ঈমান আনে। 

পাথর ছুঁড়ে একটি বিশাল প্রাণীকে মারার মাধ্যমে বালকটির ঈমান আরও দৃঢ় হয় এবং সে আল্লাহর অনুগ্রহে রোগীদের সুস্থ করতে শুরু করে (সহীহ মুসলিম, ৩০০৫)। জালিম বাদশাহ তাকে হত্যার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় এবং শেষ পর্যন্ত বালকটি নিজের রবের নাম নিয়ে তীরের আঘাতে শাহাদাত বরণ করে যা দেখে উপস্থিত জনতা মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে। ঈমানদাররা আগুনের গর্তে শাহাদাত বরণ করেও বিজয়ী হয়েছিল কারণ প্রকৃত বিজয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনেই নিহিত।

প্রকৃত বিজয় কখনোই অস্ত্রের জোরে বা সৈন্যসংখ্যার আধিক্যে আসে না বরং এটি আসে একমাত্র মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং অদৃশ্যের প্রতি অটল ঈমানের মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে সম্মিলিতভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না (সূরা আলে-ইমরান, ৩:১০৩)। অথচ আজ মুসলিম দেশগুলোতেই পশ্চিমা সামরিক ঘাঁটি তৈরি হয়েছে এবং মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করছে যা বিভক্তির একটি ভয়াবহ পরিণাম। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আল্লাহর কাছে থাকলেও একজন মুমিনের করণীয় হলো ঈমান মজবুত করা এবং ইলম অর্জনে নিজেকে নিয়োজিত করা। মুসলিম যুবসমাজকে প্রযুক্তি এবং গবেষণায় এগিয়ে আসতে হবে কারণ কুরআনের প্রথম শব্দই হলো ইকরা যার অর্থ পড়ো (সূরা আল-আলাক, ৯৬:১)। ফিতনার এই সময়ে ঈমানদারদের ধৈর্য ধরতে হবে এবং মজলুমদের জন্য দুয়া করতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন এমন ফিতনা আসবে যেখানে বসে থাকা ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির চেয়ে ভালো থাকবে (সহীহ আল-ব্যুখারী, ৩৬০১)। 

ইতিহাসের প্রতিটি জালিম সাম্রাজ্য একদিন ধ্বংস হয়েছে এবং বর্তমান যুলুমবাজ শক্তিগুলোর পতনও অনিবার্য কারণ আল্লাহ বলেছেন যালিমরা শীঘ্রই জানতে পারবে তারা কোথায় ফিরবে (সূরা আশ-শুয়ারা, ২৬:২২৭)। এই সংকটকালে মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকতে হবে যেন আমরা মহান আল্লাহর সাহায্য লাভের যোগ্য হতে পারি।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

সংবাদ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!