মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন অপরাধবোধের দংশন তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়। জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে তাকালে যখন কেবলই ভুলের পাহাড় আর পাপের স্তূপ চোখে পড়ে, তখন নিজের প্রতিই এক তীব্র ঘৃণা জন্ম নেয়। শয়তান মানুষের এই দুর্বল মুহূর্তটিকেই ব্যবহার করে তার মনের ভেতর হতাশার বিষ ঢুকিয়ে দেয়। সে মানুষকে বোঝাতে চায় যে তার পাপের পরিমাণ এতই বেশি যে আল্লাহর ক্ষমা তার নসিব হবে না। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, আল্লাহর রহমত মানুষের সমস্ত কল্পনার চেয়েও বিশাল। ইসলামের ইতিহাসে এমন এক ব্যক্তির ঘটনা রয়েছে যার পাপের বোঝা বর্তমান সময়ের যেকোনো মানুষের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি ছিল, তবুও কেবল তওবার আকুতি তাকে জান্নাতের উচ্চ মাকামে পৌঁছে দিয়েছে।
হতাশা: শয়তানের এক শক্তিশালী অস্ত্র আপনি যখন নিজেকে জাহান্নামের যোগ্য মনে করে হাল ছেড়ে দিচ্ছেন, ঠিক তখনই শয়তান তার চূড়ান্ত বিজয় উদযাপন করে। হতাশ হওয়া মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়, বরং এটি কুফরির নামান্তর। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা পবিত্র কোরআনে এমন এক ভাষায় আমাদের ডেকেছেন, যা শুনলে পাষাণ হৃদয়ও গলে যায়। তিনি সূরা আয-জুমারে ইরশাদ করেন: “বলো, ‘হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেন’” (সূরা আয-জুমার, ৩৯:৫৩)। লক্ষ্য করুন, আল্লাহ এখানে আমাদের ‘পাপী’ বলে তিরস্কার না করে ‘ইয়া ইবাদি’ বা ‘হে আমার বান্দাগণ’ বলে মমতার সাথে ডেকেছেন।
১০০ খুনের সেই শিহরণ জাগানো ঘটনা রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের বনী ইসরাঈলের যুগের এক ব্যক্তির ঘটনা শুনিয়েছেন। সেই ব্যক্তিটি ছিল একজন সিরিয়াল কিলার, যে একে একে নিরানব্বই জন মানুষকে হত্যা করেছিল। এই বিশাল অপরাধের পর যখন তার অন্তরে অনুশোচনা জন্ম নিল, সে মুক্তির পথ খুঁজতে লাগল। সে একজন পাদ্রীর কাছে গিয়ে জানতে চাইল তার কি ক্ষমার কোনো সুযোগ আছে? পাদ্রী তার অপরাধের ভয়াবহতা দেখে বলে দিল যে তার কোনো ক্ষমা নেই। এই চূড়ান্ত হতাশায় সে সেই পাদ্রীকেও হত্যা করে ফেলল, ফলে তার খুনের সংখ্যা পূর্ণ হলো একশতে।
কিন্তু যার অন্তরে হেদায়াতের নূর জ্বলে ওঠে, সে থামতে পারে না। এরপর সে একজন প্রকৃত আলেম বা জ্ঞানী ব্যক্তির সন্ধান পেল। সেই আলেম তাকে আশার বাণী শোনালেন এবং বললেন, “অবশ্যই! তোমার এবং তওবার মাঝে কে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে?” তিনি তাকে পাপের এলাকা ছেড়ে নেককারদের এক গ্রামে হিজরত করার পরামর্শ দিলেন। লোকটি যখন সেই নতুন গ্রামের পথে রওনা হলো, মাঝপথে তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলো। সে যখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিল, তখনও তার আকুতি ছিল আল্লাহর রহমতের দিকে।
আল্লাহর অলৌকিক ফয়সালা তার মৃত্যুর পর রহমত ও আযাবের ফেরেশতাদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হলো। আযাবের ফেরেশতারা তাকে পাপিষ্ঠ দাবি করল, আর রহমতের ফেরেশতারা তার তওবার কথা উল্লেখ করল। আল্লাহ তা‘আলা তখন এক অলৌকিক ঘটনা ঘটালেন। তিনি নেককারদের ভূমিকে তার লাশের কাছে সরে আসতে বললেন এবং পাপের ভূমিকে দূরে সরে যেতে বললেন। ফেরেশতারা যখন মাপলেন, দেখা গেল সে নেককারদের গ্রামের দিকে মাত্র আধা হাত পরিমাণ বেশি এগিয়ে আছে। কেবল এই সামান্য প্রচেষ্টার কারণেই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে জান্নাতুল ফিরদাউসের মেহমান হিসেবে কবুল করে নিলেন।
উপসংহার আপনার অতীত যত অন্ধকারই হোক, আল্লাহর রহমতের আলো দিয়ে তা মুছে ফেলা সম্ভব। আপনি যদি একশ জন মানুষকে খুন না করে থাকেন, তবে কেন নিরাশ হচ্ছেন? আজই উঠে দাঁড়ান, ওজু করে জায়নামাজে রবের সামনে লুটিয়ে পড়ুন। আপনার চোখের এক ফোঁটা পানি জাহান্নামের আগুন নিভিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ আপনাকে বুকে জড়িয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত, শুধু আপনি তাঁর দিকে এক পা বাড়িয়ে দিন।

আপনার মতামত লিখুন :