চোখের পলকে রহমতের দশ দিন চলে গেল, এরপর মাগফিরাতের দশ দিনও প্রায় শেষের পথে। এরপর আসবে নাজাতের সেই শেষ দশক। ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো কী দ্রুতই না উল্টে যাচ্ছে! রমজান শুরু হওয়ার আগে আমাদের কত পরিকল্পনা ছিল—এবার আমি বদলে যাব, অনেক ইবাদত করব, পুরো কোরআন বুঝে পড়ব। কিন্তু রমজানের প্রায় অর্ধেক পার হওয়ার পর আমরা যখন আয়নার সামনে দাঁড়াই, তখন অনেকেই এক তীব্র অনুশোচনা অনুভব করি। মনে হয়, "আমি কি আদৌ কিছু করতে পেরেছি? আমার উপবাস কি শুধু উপবাসই থেকে যাচ্ছে?" এই না পাওয়ার বেদনা দূর করতে এবং রমজানের প্রতিটি মুহূর্তকে সার্থকতা দিতে প্রয়োজন একটি সঠিক রোডম্যাপ। রমজান কেবল সওয়াব অর্জনের মৌসুম নয়, এটি হলো আত্মাকে নতুন করে সাজানোর এক অলৌকিক কর্মশালা। আজ আমরা এমন ৭টি আমল নিয়ে আলোচনা করব যা আপনার এই রমজানকে ইনশাআল্লাহ, এক আমূল পরিবর্তনকারী যাত্রায় পরিণত করবে।
১. নিয়তের পরিশুদ্ধি ও দৈনন্দিন কাজকে ইবাদতে রূপান্তর আমাদের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নিয়তকে ঠিক করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “সমস্ত কাজের ফলাফল নির্ভর করে নিয়তের উপর”
। আপনি আপনার দৈনন্দিন সাধারণ কাজগুলোকেও শুধুমাত্র একটি বিশুদ্ধ নিয়তের মাধ্যমে ইবাদতে পরিণত করতে পারেন। যখন আপনি সাহরির জন্য উঠছেন বা ইফতারের আয়োজন করছেন, তখন নিয়ত করুন যে আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এটি করছেন। এমনকি রাতে দীর্ঘ ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয় করতে যে টুকু ঘুমান বা বিশ্রাম নেন, সেটিও সওয়াবের কারণ হবে যদি আপনার নিয়ত সহিহ থাকে।২. অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রোজা নিশ্চিত করা রোজা মানে শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকা নয়। প্রকৃত রোজা হলো আপনার প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পাপ থেকে বিরত রাখা। রাসূলুল্লাহ ﷺ সতর্ক করেছেন যে, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ আমল ত্যাগ করল না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই
। আপনার চোখের রোজা হলো হারাম কিছু না দেখা, কানের রোজা হলো গীবত বা অশ্লীল কথা না শোনা এবং জিহ্বার রোজা হলো গালিগালাজ বা পরনিন্দা থেকে বিরত থাকা।৩. কোরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক ও `তাদাব্বুর` রমজান হলো কোরআন নাজিলের মাস। অনেকেই আমরা এই মাসে দ্রুতগতিতে কোরআন খতম করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হই। খতম করা সওয়াবের কাজ হলেও, কোরআনের মূল দাবি হলো একে নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা বা `তাদাব্বুর` করা। এই রমজানে লক্ষ্য নির্ধারণ করুন যে প্রতিদিন অন্তত একটি আয়াত হলেও অর্থ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীরসহ পড়বেন এবং তা নিজের জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন।
৪. রাতের ইবাদত ও শেষ দশকের গুরুত্ব দিনের রোজার পাশাপাশি রাতের কিয়াম বা ইবাদত রমজানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারাবীহর সালাত এবং রাতের শেষ ভাগে অন্তত দুই রাকাত তাহাজ্জুদ পড়ার চেষ্টা করুন। কারণ এই সময়ে আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দার দোয়া কবুল করেন। বিশেষ করে শেষ দশকে ইবাদতের গতি বাড়িয়ে দিন, কারণ এই সময়েই রয়েছে লাইলাতুল কদর—যা হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। রাসূলুল্লাহ ﷺ শেষ দশকে সারা রাত জেগে থাকতেন এবং তাঁর পরিবারবর্গকেও জাগিয়ে দিতেন
।৫. দানশীলতা ও ভ্রাতৃত্বের হাত প্রসারিত করা রমজান হলো সহমর্মিতার মাস। রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল, আর রমজানে তাঁর দানশীলতা বহুগুণে বেড়ে যেত
। সম্ভব হলে অন্য রোজাদারকে ইফতার করান, কারণ এতে সেই রোজাদারের সমান সওয়াব পাওয়া যায় কোনো সওয়াব ঘাটতি ছাড়াই ।৬. দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ দোয়া হলো ইবাদতের মগজ। রমজান মাসে রোজাদার ব্যক্তির দোয়া আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না
। বিশেষ করে ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তটি দোয়া কবুলের জন্য এক অসাধারণ সময়। এই সময়টা দুনিয়াবী গল্প-গুজব বা সোশ্যাল মিডিয়ায় নষ্ট না করে কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে নিজের এবং উম্মাহর জন্য প্রার্থনা করুন।৭. আমলের ধারাবাহিকতা বা ইস্তিকামাত রমজানের শুরুতে আমাদের যে উদ্দীপনা থাকে, তা অনেক সময় মাসের মাঝামাঝি সময়ে কমে আসে। কিন্তু আল্লাহর কাছে সেই আমলই সবচেয়ে প্রিয় যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হোক
। প্রতিদিনের জন্য একটি বাস্তবসম্মত রুটিন তৈরি করুন এবং রমজানের শেষ দিন পর্যন্ত তাতে অটল থাকুন।পরিশেষে, রমজান এক দ্রুতগামী অতিথি। সে আমাদের দুয়ারে এসেছে আমাদের পাপগুলোকে ক্ষমা করিয়ে আমাদের জান্নাতের নিকটবর্তী করার জন্য। আসুন, আমরা এই অতিথির সঠিক কদর করি। আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন আল্লাহর জিকিরে সজীব থাকে। আল্লাহ আমাদের এই রমজানকে মাগফিরাত ও নাজাতের অসিলা হিসেবে কবুল করুন। আমীন।

আপনার মতামত লিখুন :