পশ্চিম আকাশে যখন এক ফালি সরু বাঁকা চাঁদ উঁকি দেয়, তখন সমগ্র মুসলিম বিশ্বের হৃদয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তির ঢেউ খেলে যায়। এটি কেবল একটি মহাজাগতিক দৃশ্য নয়, বরং রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আসা পবিত্র রমজান মাসের আগমনী সংকেত। দীর্ঘ এক বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এই মাসটি আমাদের মাঝে ফিরে আসে আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার সওগাত নিয়ে। মসজিদগুলো মুখরিত হয়ে ওঠে তারাবীহর তিলাওয়াতে, আর প্রতিটি ঘরে ঘরে শুরু হয় সাহরি ও ইফতারের আয়োজন। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় যদি আমরা দৃষ্টি দিই, তবে এক বিস্ময়কর সত্য উন্মোচিত হয়—সিয়াম সাধনা বা রোজা মানব ইতিহাসের কোনো নতুন অধ্যায় নয়। এটি একটি চিরায়ত ইবাদত, যা যুগে যুগে নবী-রাসূলদের আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণের অংশ ছিল।
পূর্ববর্তী নবীদের যুগে রোজার ইতিহাস অনেকেই মনে করেন রোজা বুঝি শুধুমাত্র শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের ওপরই ফরজ করা হয়েছে। তবে পবিত্র কুরআন এই ধারণাটি সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে। সূরা বাকারায় আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো” (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৩)। নির্ভরযোগ্য তাফসীর গ্রন্থ যেমন ‘রুহুল মা‘আনী’ থেকে জানা যায়, আদি পিতা হযরত আদম (আ.) এবং মা হাওয়া (আ.) দুনিয়ায় প্রেরিত হওয়ার পর তওবা স্বরূপ ধারাবাহিকভাবে ৪০ বছর রোজা রেখেছিলেন। এটিই ছিল মানব ইতিহাসের রোজার আদি রূপ। হযরত নূহ (আ.)-এর যুগ থেকে প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ (আইয়্যামে বিজ) রোজা রাখার বিধান প্রচলিত ছিল। এমনকি হযরত মুসা (আ.) ও হযরত ঈসা (আ.)-ও তুর পাহাড় ও মরুভূমিতে দীর্ঘ ৪০ দিন করে রোজা রেখেছিলেন বলে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত।
উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর রমজান ফরজ হওয়ার প্রেক্ষাপট মক্কার জীবনে মুসলমানদের ওপর কোনো নির্দিষ্ট মাসের রোজা ফরজ ছিল না। নবুয়তের দ্বাদশ বর্ষে মদিনায় হিজরত করার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) দেখলেন, সেখানকার ইহুদিরা মহররম মাসের ১০ তারিখে (আশুরা) রোজা রাখছে। তারা হযরত মুসা (আ.)-এর ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তির কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এই রোজা রাখত। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “মুসা (আ.)-এর অনুসরণের ক্ষেত্রে তোমাদের চেয়ে আমরাই বেশি হকদার।” এরপর তিনি নিজে এবং সাহাবায়ে কেরাম আশুরার রোজা রাখা শুরু করেন। ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে এই আশুরার রোজা এবং প্রতি মাসের তিন দিন রোজা রাখা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব বা আবশ্যক ছিল।
২য় হিজরি: হিজরি দ্বিতীয় সন, শাবান মাস। নবুয়তের প্রায় ১৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর মহান আল্লাহ মুসলিম উম্মাহর জন্য ঐতিহাসিক ঘোষণা দিলেন। নাযিল হলো সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াত: “রমজান মাসই হলো সেই মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে... সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এই মাস পাবে, তারা যেন এতে রোজা রাখে।” এই আয়াতের মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে রমজান মাসের সিয়াম সাধনা ফরজ করা হয় এবং পূর্ববর্তী আশুরার রোজার আবশ্যকতা রহিত হয়ে তা নফলে পরিণত হয়। আল্লাহ রমজান মাসকেই বেছে নিলেন কারণ এই মাসেই লওহে মাহফুজ থেকে পবিত্র কুরআন দুনিয়ার আসমানে অবতীর্ণ হয়েছে। কুরআন হলো মানবতার মুক্তির সনদ, আর রোজা হলো সেই সনদ ধারণ করার আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি।
উপসংহার: তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষণ রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় মোট নয়টি রমজান পেয়েছিলেন। তিনি উম্মতকে শিখিয়ে গেছেন কীভাবে শুধু পানাহার বর্জন নয়, বরং চোখ, কান, জিহ্বা ও অন্তরের রোজা পালনের মাধ্যমে প্রকৃত ‘মুত্তাকি’ হওয়া যায়। রমজান আমাদের পশুপ্রবৃত্তি দমন করে মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেয়। হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু হওয়া সেই তাকওয়ার মশাল আজ আমাদের হাতে। তাই প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে রবের সন্তুষ্টি অর্জন করাই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য।

আপনার মতামত লিখুন :