বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২ ফাল্গুন ১৪৩২

আপনার যাকাত কি সঠিক খাতে পৌঁছাচ্ছে? হকদার চেনার পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬, ০১:১৮ পিএম
আপনার যাকাত কি সঠিক খাতে পৌঁছাচ্ছে? হকদার চেনার পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন

যাকাত: সম্পদের পবিত্রতা ও সামাজিক ভারসাম্য / Ai

মানুষের জীবন এক বিরামহীন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র যেখানে অঢেল সম্পদ আর বিলাসিতার মোহ আমাদের প্রায়ই অন্ধ করে রাখে। আমরা যখন আমাদের অর্জিত প্রাচুর্যকে একান্তই নিজের মনে করি, তখন আমরা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ যাকাতের কথা ভুলে যাই। যাকাত কেবল একটি আর্থিক লেনদেন নয়, বরং এটি মানুষের নাফসের ময়লা পরিষ্কার করার এক অলৌকিক পদ্ধতি। যাকাত শব্দের অর্থই হলো বৃদ্ধি পাওয়া, পবিত্র হওয়া এবং বরকত লাভ করা। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে সালাতের পাশাপাশি যাকাতের নির্দেশ দিয়ে স্পষ্ট করেছেন যে, রবের সামনে সিজদাহ করার পর তাঁর অভাবী বান্দাদের প্রতি দায়িত্ব পালন না করলে সেই ইবাদত পূর্ণতা পায় না (সূরা আল-বাকারা, ২:১১০)। যাকাত কোনো দয়া বা করুণা নয়, বরং এটি দাতা ও গ্রহীতার মাঝে একটি ঐশী মেলবন্ধন যা সম্পদের পাহাড় গড়া থেকে মানুষকে বিরত রাখে।

যাকাতের নিসাব ও ফরয হওয়ার শর্তাবলি যাকাত ফরয হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক হতে হয়, যাকে শরীয়তের পরিভাষায় ‍‍`নিসাব‍‍` বলা হয়। যদি কারো কাছে সাড়ে সাত তোলা (৮৭.৪৮ গ্রাম) স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা (৬১২.৩৬ গ্রাম) রৌপ্য অথবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ, ব্যবসায়িক পণ্য বা সঞ্চয়পত্র এক বছর যাবৎ জমা থাকে, তবে তার ওপর যাকাত প্রদান করা ফরয হয়ে যায়। এটি কেবল অতিরিক্ত সম্পদের আড়াই শতাংশ ($2.5\%$) যা আপনার মোট সম্পদকে পবিত্র করে এবং অবশিষ্ট সম্পদে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ বরকত নিয়ে আসে। এই বিধান পালনে অবহেলা করা মানে হলো মহান আল্লাহর আমানতের খেয়ানত করা এবং দরিদ্রদের অধিকার হরণ করা।

যাকাতের আটটি খাত: সঠিক হকদার কারা? যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর সঠিক খাত বা হকদার চেনা। মহান আল্লাহ সূরা আত-তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে যাকাতের আটটি খাতের কথা সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন:

১. ফকির: যাদের জীবন ধারণের জন্য ন্যূনতম সম্পদটুকুও নেই।

২. মিসকিন: যারা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও আত্মসম্মানের খাতিরে কারো কাছে হাত পাততে পারে না।

৩. যাকাত আদায়কারী কর্মচারী: যারা সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক যাকাত ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত।

৪. নওমুসলিম: যাদের মন জয় করা বা ইসলামে দৃঢ় রাখার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।

৫. দাসমুক্তি: বর্তমান যুগে এটি প্রায় অনুপস্থিত হলেও মানুষের পরাধীনতা ঘোচাতে এই অর্থ ব্যয় করা হয়।

৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি: যারা বৈধ কারণে ঋণ নিয়ে ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে পড়েছেন।

৭. ফি সাবিলিল্লাহ: আল্লাহর পথে দ্বীন প্রতিষ্ঠা বা দ্বীনি ইলম প্রসারে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ।

৮. মুসাফির: যদি কোনো ভ্রমণকারী সফরে এসে নিঃস্ব হয়ে যান, তবে তিনি যাকাত পাওয়ার যোগ্য।

কাদের যাকাত দেওয়া যাবে না? যাকাত বণ্টনের ক্ষেত্রে কিছু আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যেমন, নিজের উসুল ও ফুরু অর্থাৎ বাবা-মা, দাদা-দাদী কিংবা সন্তান ও নাতি-নাতনিদের যাকাত দেওয়া যায় না, কারণ তাদের লালন-পালন করা দাতার সহজাত দায়িত্ব। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে যাকাত দিতে পারবেন না। এছাড়া ধনী ব্যক্তি এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর পবিত্র বংশধরদের জন্য যাকাত গ্রহণ করা শরীয়তে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যাকাত দেওয়ার ক্ষেত্রে কাছের আত্মীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত যদি তারা উপরোক্ত আটটি খাতের অন্তর্ভুক্ত হন, কারণ এতে সওয়াব ও আত্মীয়তার বন্ধন—উভয়ই রক্ষিত হয়।

অবহেলার ভয়াবহ পরিণাম ও সামাজিক গুরুত্ব সহীহ আল-বুখারীর ১৩৯৫ নম্বর হাদীসে যাকাতকে ইসলামের এক অপরিহার্য স্তম্ভ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। যারা যাকাত আদায় করে না, কিয়ামতের দিন তাদের সম্পদ বিষধর সাপ হয়ে তাদের দংশন করবে। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে যাকাত হলো একটি দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি। এটি সমাজের আকাশচুম্বী বৈষম্য দূর করে এবং সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে। আমরা যখন সিজদাহয় যাই, তখন যেন আমাদের মনে পড়ে সেই সব মানুষের কথা যারা ফুটপাতে না খেয়ে শুয়ে থাকে। আমাদের যাকাত হতে পারে তাদের মুখে হাসি ফোটানোর এক অসিলা। যাকাত কেবল সম্পদ কমায় না, বরং সমাজকে কলুষমুক্ত করে একটি শান্তিময় পৃথিবী উপহার দেয়।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

সংবাদ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!