রমজান মাস—মুমিন হৃদয়ের বসন্তকাল, মহান রবের পক্ষ থেকে আসা এক পবিত্র সওগাত। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও পাপাচার থেকে বিরত থেকে আমরা যে সিয়াম সাধনা করি, তা কেবল আল্লাহর ভালোবাসার এক চূড়ান্ত পরীক্ষা। প্রতিটি মুমিন বান্দা এই মাসে অত্যন্ত সতর্ক থাকেন যাতে সামান্য ভুলেও ইবাদতটি নষ্ট না হয়। তবে শয়তান অনেক সময় আমাদের এই সতর্কতাকেই পুঁজি করে মনের ভেতর নানা রকম অযৌক্তিক সন্দেহ বা ‘ওয়াসওয়াসা’ তৈরি করে। আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমন কিছু ধারণা মিশে আছে, যার সাথে ইসলামি শরীয়তের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। এর মধ্যে অন্যতম হলো— রোজা রাখা অবস্থায় কি চুল বা নখ কাটা যাবে?
রোজা ভঙ্গের প্রকৃত মানদণ্ড
ইসলামি শরীয়তের মূলনীতি বা ‘উসুল’ অনুযায়ী, রোজা ভঙ্গ হওয়ার জন্য কোনো বস্তু শরীরের স্বাভাবিক প্রবেশপথ (যেমন মুখ বা নাক) দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা আবশ্যক। অথবা শরীর থেকে এমন কিছু নির্গত হওয়া যা শরীরকে দুর্বল করে দেয় (যেমন ইচ্ছাকৃত বীর্যপাত)।
বিবেচ্য বিষয়: মাথার চুল বা হাতের নখ কি কোনোভাবেই পাকস্থলী বা পেটের সাথে যুক্ত? চুল কাটলে কি ক্ষুধা নিবারণ হয়? উত্তর হলো— না।
ইসলামি ফিকহবিদগণের সর্বসম্মত রায় বা ‘ইজমা’ হলো— রোজা রাখা অবস্থায় চুল কাটা, দাড়ি ছাঁটা, নখ কাটা বা শরীরের অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করা সম্পূর্ণ জায়েজ এবং বৈধ। এতে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না এবং সওয়াবও কমে না।
পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ: হাদিসের শিক্ষা
ইসলাম হলো ‘ফিতরাত’ বা মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম। আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে পরিচ্ছন্ন দেখতে ভালোবাসেন। সহীহ মুসলিমের একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ নখ কাটা ও শরীরের পরিচ্ছন্নতার জন্য সর্বোচ্চ ৪০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন (সহীহ মুসলিম, ২৫১)। রমজান মাস ৩০ দিনের। যদি কেউ মনে করে রমজানে চুল-নখ কাটা যাবে না, তবে সে কি পুরো মাস অপরিচ্ছন্ন থাকবে? এটি ইসলামের রুচি ও সুন্নাহর পরিপন্থী।
রাসুলুল্লাহ ﷺ রমজান মাসেও মেসওয়াক করতেন এবং প্রচণ্ড গরমে রোজার কষ্ট লাঘব করার জন্য মাথায় পানি ঢালতেন (সুনান আবু দাউদ, ২৩৬৫)। যদি বাহ্যিক অংশে পানি লাগলে রোজা না ভাঙে, তবে শরীরের বাহ্যিক মৃত কোষ বা অংশ (চুল/নখ) বিচ্ছিন্ন করলে রোজা ভাঙার কোনো প্রশ্নই আসে না।
কুসংস্কারের উৎস ও প্রতিকার
আমাদের সমাজে এই ভুল ধারণাটি মূলত অজ্ঞতা থেকে তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, রোজা রাখা মানে হলো মৃতপ্রায় হয়ে থাকা। অথচ আল্লাহ তাআলা কোরআনে ইবাদতের সময় সাজসজ্জা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা আল-আরাফ, ৭:৩১)। রোজা রেখে জুমার নামাজের আগে গোসল করা, নখ কাটা বা চুল ছোট করা মুমিনের সৌন্দর্যেরই অংশ। এতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন না, বরং পরিচ্ছন্ন বান্দাকে ভালোবাসেন।

আপনার মতামত লিখুন :