বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২ ফাল্গুন ১৪৩২

রোজা ভঙ্গের কবীরা গুনাহ: দুনিয়া ও আখিরাতের কঠিন শাস্তি সম্পর্কে জানুন

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬, ০২:০২ পিএম
রোজা ভঙ্গের কবীরা গুনাহ: দুনিয়া ও আখিরাতের কঠিন শাস্তি সম্পর্কে জানুন

রমজানে রোজা ভঙ্গের বিধান ও আত্মশুদ্ধি / Ai

রমজান মাস আমাদের মাঝে উপস্থিত হয় রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে। প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে এই মাসকে ঘিরে থাকে এক পবিত্র অনুভূতি। আমরা সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত শুধুমাত্র মহান রবের সন্তুষ্টির আশায় পানাহার ও প্রবৃত্তি বর্জন করি। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই, কেবল নফসের তাড়নায় বা অবহেলায় এই পবিত্র মাসের ফরজ রোজাটি ভেঙে ফেলে, তখন তা কেবল একটি ইবাদত বর্জন নয়, বরং মহান আল্লাহর হুকুমের সাথে এক চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ হিসেবে গণ্য হয়। ইসলামের সুমহান শিক্ষার আলোকে ইচ্ছাকৃত রোজা ভঙ্গের পরিণতি অত্যন্ত গুরুতর, যা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অপরিহার্য।

শরীয়তসম্মত ওজরে রোজা ভঙ্গের বিধান ইসলাম একটি মানবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের সাধ্যের বাইরে কোনো বোঝা চাপিয়ে দেন না (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৫)। যদি কোনো ব্যক্তি অসুস্থতা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কায়, দীর্ঘ সফরে (প্রায় ৮০ কিলোমিটার) ক্লান্তিজনিত কারণে, নারীদের মাসিক স্রাব (হায়েজ) বা প্রসব পরবর্তী রক্তস্রাবের (নেফাস) কারণে রোজা রাখতে না পারে, তবে আল্লাহ ছাড় দিয়েছেন। এছাড়া গর্ভবতী বা দুগ্ধদানকারী মা যদি নিজের বা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা করেন, তবে তাদের জন্যও রোজা ভাঙার অনুমতি আছে। এই অনিবার্য কারণগুলোর জন্য ভাঙা রোজাটির পরিবর্তে রমজানের পর শুধুমাত্র একটি ‍‍`কাজা‍‍` (Qaza) বা একটির বদলে একটি রোজা আদায় করলেই হবে, কোনো জরিমানা বা কাফফারা দিতে হবে না।

ইচ্ছাকৃত রোজা ভঙ্গের ভয়াবহতা ও শাস্তি বিনা ওজরে ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভাঙা ইসলামের দৃষ্টিতে একটি জঘন্যতম কবীরা গুনাহ। ইমাম যাহাবী (রহ.)-এর মতো প্রখ্যাত আলেমদের মতে, যে ব্যক্তি ওজর ছাড়া রোজা ত্যাগ করে, সে একজন ব্যভিচারী বা মদ্যপায়ী থেকেও নিকৃষ্ট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি দীর্ঘ হাদীসে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি স্বপ্নে দেখেছেন একদল মানুষকে উল্টোভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে এবং তাদের চোয়াল ফাড়া, যেখান থেকে রক্ত ঝরছে। তারা হলো সেই হতভাগা, যারা সময় হওয়ার আগেই (বিনা কারণে) রোজা ভেঙে ফেলেছিল (সহীহ ইবনে খুজাইমা)। এছাড়া রাসূলুল্লাহ ﷺ সতর্ক করেছেন যে, কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে একটি রোজা ভাঙে, তবে সে যদি সারা জীবনও রোজা রাখে, তবুও ওই একটি রমজানের রোজার বিশেষ ফজিলত ও বরকতের ক্ষতিপূরণ করতে পারবে না (সুনানে তিরমিযী, ৭২৩)।

কাজা ও কাফফারার বিস্তারিত বিধান ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার বা স্ত্রী সহবাসের মাধ্যমে রোজা ভাঙলে ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী ‍‍`কাজা‍‍` ও ‍‍`কাফফারা‍‍` (Kaffara) উভয়ই ওয়াজিব হয়। কাফফারা হলো আল্লাহর বিধান লঙ্ঘনের একটি কঠিন দণ্ড। এর বিধানগুলো হলো: ১. একটি দাস মুক্ত করা: যা বর্তমান যুগে দাসপ্রথা না থাকায় প্রযোজ্য নয়। ২. টানা ৬০টি রোজা রাখা: ইচ্ছাকৃতভাবে একটি রোজা ভাঙার শাস্তি হিসেবে একটানা দুই মাস বা ৬০ দিন রোজা রাখতে হবে। এর মাঝে একদিনও যদি বিরতি হয় (শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া), তবে পুনরায় প্রথম থেকে গণনা শুরু করতে হবে। ৩. ৬০ জন মিসকিনকে খাওয়ানো: যদি কেউ বার্ধক্য বা স্থায়ী অসুস্থতার কারণে টানা ৬০টি রোজা রাখতে অক্ষম হন, তবে তাকে ৬০ জন অভাবী মানুষকে দুই বেলা পেট ভরে খাওয়াতে হবে।

বাঁচার উপায় ও তওবা শয়তান মুমিনকে ধোঁকা দিতে পারে যে "পরে কাজা করে নেব", কিন্তু রমজানের বরকত সারা জীবনের ইবাদতেও ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। রোজা ভঙ্গের এই মহাপাপ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো কাজা ও কাফফারা আদায়ের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে চোখের পানি ফেলে খালেস দিলে তওবা করা। আমাদের উচিত রমজানের প্রতিটি মুহূর্তকে জান্নাত কামানোর সুযোগ হিসেবে দেখা এবং নফসের প্রলোভন থেকে বেঁচে এই পবিত্র ইবাদতকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া। হে আল্লাহ! আমাদের সকলকে রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করার এবং সকল বিধান যথাযথভাবে পালনের তৌফিক দান করুন। আমিন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

সংবাদ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!