মানুষের যাপিত জীবনের যান্ত্রিকতার ভিড়ে রমজান আসে এক আধ্যাত্মিক বসন্ত হয়ে। এই পবিত্র মাসে মুমিনের রূহানি উন্নতির জন্য দুটি বিশেষ মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—সেহেরি ও ইফতার। আমাদের অনেকের কাছে এগুলো কেবল খাবার গ্রহণের সময় মনে হতে পারে, কিন্তু ইসলামের সুগভীর দর্শনে এই দুই মুহূর্তের রয়েছে অকল্পনীয় হাকিকত। সেহেরি হলো আগামী দিনের সংগ্রামের পাথেয়, আর ইফতার হলো দীর্ঘ সাধনার পর রবের পক্ষ থেকে পাওয়া এক পরম তৃপ্তি।
সেহেরি কেবল উদরপূর্তি নয়, বরং এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এক অনন্য সুন্নাহ। নবীজি ﷺ ইরশাদ করেছেন, "তোমরা সেহেরি খাও, কারণ সেহেরিতে বরকত রয়েছে" (সহীহ বুখারী, ১৯২৩)। এই বরকত কেবল খাবারের পুষ্টির মাঝে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সময়ের বরকত। যখন সারা পৃথিবী গভীর ঘুমে মগ্ন থাকে, তখন মুমিন বান্দা কেবল রবের সন্তুষ্টির আশায় শয্যা ত্যাগ করে। এটিই সেই মহিমান্বিত সময় যখন মহান আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দাদের ডাকতে থাকেন ক্ষমার জন্য (সহীহ বুখারী, ১১৪৫)। আমাদের সেহেরি যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা না হয়, বরং তা যেন হয় আগামী দিনের সিয়ামের জন্য এক মানসিক ও আত্মিক প্রস্তুতি।
সিয়ামের দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও আনুগত্যের পরীক্ষা সুবহে সাদিকের রক্তিম আভা ফুটে ওঠার সাথে সাথেই আমরা পানাহার ত্যাগ করি। সারাটা দিন তৃষ্ণায় বুক ফেটে যায়, শরীর অবসন্ন হয়ে আসে, কিন্তু স্রেফ আল্লাহর ভয়ে আমরা এক ফোঁটা পানিও মুখে দেই না। এই যে নিঃশর্ত আনুগত্য, এটাই হলো সিয়ামের আসল সার্থকতা। এই সাধনা আমাদের শেখায় কীভাবে প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং আল্লাহর মহব্বতে নিজেকে বিলিয়ে দিতে হয়।
ইফতার: দোয়ার কবুলিয়াত ও ভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধন দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সূর্যাস্তের সেই মুহূর্তটি হলো ইফতার। রাসূলুল্লাহ ﷺ দ্রুত ইফতার করার মধ্যে কল্যাণ নিহিত রেখেছেন (সহীহ বুখারী, ১৯৫৭)। সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে খেজুর ও পানি দিয়ে রোজা ভাঙার মাঝে রয়েছে এক অপার্থিব প্রশান্তি। ইফতারের পূর্ব মুহূর্তটি অত্যন্ত আবেগঘন; কারণ এটি সেই সময় যখন আল্লাহ বান্দার কোনো দোয়াই ফিরিয়ে দেন না (সুনানে তিরমিযী, ৩৫৯৮)। এছাড়া ইফতার কেবল নিজের ভোগের জন্য নয়, বরং এটি অন্যের প্রতি সমবেদনা জানানোরও সুযোগ। অন্যকে ইফতার করানোর মাধ্যমে বিপুল সওয়াবের হাতছানি আমাদের সামনে থাকে, যা উম্মাহর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।
আমাদের সেহেরি ও ইফতার যেন নিছক ভোজনবিলাসে পরিণত না হয়। অতিরিক্ত আহার পরিহার করে এবং হালাল উপার্জনের লোকমা গ্রহণের মাধ্যমে আমাদের সিয়ামকে পবিত্র রাখতে হবে। আল্লাহ আমাদের এই রমজানকে কবুল করুন এবং আমাদের অতীতের সকল পাপ মোচন করে তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন।

আপনার মতামত লিখুন :