রমজান মাস—মুমিন হৃদয়ের বসন্তকাল, তাকওয়া অর্জনের এক মহিমান্বিত মৌসুম। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করে আমরা যে সিয়াম পালন করি, তা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই। প্রতিটি রোজাদার ব্যক্তি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সারাদিন অতিবাহিত করেন, যেন তার রোজাটি ভেঙে না যায়। কিন্তু মানুষ মাত্রই দুর্বল, আর জীবনের পরিস্থিতি সব সময় আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কখনো অসুস্থতা, কখনো সফর, আবার কখনো বা শয়তানের প্ররোচনায় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আমাদের রোজা মিস হয়ে যেতে পারে বা ভেঙে যেতে পারে।এই পরিস্থিতিতে ইসলাম আমাদের জন্য অত্যন্ত যৌক্তিক ও সুন্দর সমাধান রেখেছে। কাজা, কাফফারা ও ফিদিয়া—এই তিনটি বিধানের মাধ্যমে আমরা আমাদের ত্রুটিপূর্ণ ইবাদতকে পূর্ণতা দিতে পারি।১. কাজা (قضاء): ওজর বা বিশেষ কারণে রোজা ভাঙলেযদি কেউ শরীয়তসম্মত কোনো কারণে রোজা রাখতে না পারেন বা ভেঙে ফেলেন, তবে তার জন্য শুধু কাজা ওয়াজিব। অর্থাৎ, একটি রোজার পরিবর্তে পরবর্তীতে একটি রোজা আদায় করতে হবে।
অসুস্থতা: যদি রোজা রাখলে রোগ বেড়ে যাওয়ার বা জীবনহানির আশঙ্কা থাকে। (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৪)সফর: যদি কেউ কমপক্ষে ৪৮ মাইল বা ৭৮ কিলোমিটার দূরত্বে সফরে থাকেন।নারীদের বিশেষ অবস্থা: মাসিক স্রাব (হায়েজ) ও প্রসব পরবর্তী রক্তস্রাব (নেফাস) চলাকালীন রোজা রাখা হারাম, তবে পরে তা কাজা করতে হবে। (সহীহ মুসলিম, ৩৩৫)গর্ভধারণ ও দুগ্ধদান: যদি মা নিজের বা সন্তানের ক্ষতির প্রবল আশঙ্কা করেন।
২. কাফফারা (كفارة): ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভাঙলেবিনা কারণে বা কোনো বৈধ ওজর ছাড়া সুস্থ-সবল অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে রমজানের রোজা ভাঙা একটি জঘন্য কবীরা গুনাহ। ইমাম যাহাবী (রহ.)-এর মতে, এমন ব্যক্তি ব্যভিচারী বা মদ্যপায়ীর চেয়েও নিকৃষ্ট। এক্ষেত্রে কাজা এবং কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব।কাফফারা আদায়ের পদ্ধতি:টানা ৬০টি রোজা রাখা: ধারাবাহিকভাবে ৬০ দিন রোজা রাখতে হবে। মাঝে একদিনও বাদ দিলে পুনরায় ১ থেকে শুরু করতে হবে।
মিসকিনকে খাওয়ানো: যদি কেউ বার্ধক্য বা স্থায়ী অসুস্থতার কারণে ৬০টি রোজা রাখতে অক্ষম হন, তবে ৬০ জন মিসকিনকে দুই বেলা পেট ভরে খাবার খাওয়াতে হবে।সতর্কবাণী: রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "যে ব্যক্তি বিনা ওজরে রমজানের একটি রোজা ছেড়ে দিল, সে সারাজীবন রোজা রাখলেও ওই একটি রোজার ফজিলত আর ফিরে পাবে না।" (তিরমিযী, ৭২৩)৩. ফিদিয়া (فدية): স্থায়ীভাবে রোজা রাখতে অক্ষম হলেফিদিয়া হলো তাদের জন্য, যারা রোজা রাখতে সম্পূর্ণ ও স্থায়ীভাবে অক্ষম এবং ভবিষ্যতে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।অতিশয় বৃদ্ধ: যারা বার্ধক্যের কারণে রোজা রাখার শারীরিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন।দুরারোগ্য ব্যাধি: এমন রোগী যার সুস্থ হওয়ার আশা নেই।পদ্ধতি: প্রতিটি রোজার পরিবর্তে একজন মিসকিনকে দুই বেলা খাবার খাওয়ানো অথবা সাদাকাতুল ফিতরের সমপরিমাণ মূল্য দান করা। (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৪)একনজরে রোজা ভঙ্গের বিধানঅবস্থাকরণীয়মন্তব্যঅনিচ্ছাকৃত/ভুলবশত কিছু খেলেরোজা ভাঙবে নারোজা পূর্ণ করতে হবে।অসুস্থতা বা সফরে ভাঙলেশুধু কাজা (১টি)সুস্থ হওয়ার পর আদায় করতে হবে।ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার বা সহবাস করলেকাজা + কাফফারা১টি রোজা + টানা ৬০টি রোজা।অতি বৃদ্ধ বা মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হলেশুধু ফিদিয়ামিসকিনকে খাবার খাওয়ানো।

আপনার মতামত লিখুন :