বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২

ইসলামি জীবনব্যবস্থায় দাম্পত্য সুখ ও পরিবারের প্রকৃত সংজ্ঞা

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০১:১৬ পিএম
ইসলামি জীবনব্যবস্থায় দাম্পত্য সুখ ও পরিবারের প্রকৃত সংজ্ঞা

আদর্শ ইসলামি পরিবারের প্রতিচ্ছবি | ছবি Ai

ইসলামি সমাজব্যবস্থায় একটি পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু হলো স্বামী ও স্ত্রীর পবিত্র সম্পর্ক। এই সম্পর্কটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক মহান নেয়ামত যা কেবল জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম নয় বরং এটি পরকালীন জান্নাত অর্জনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। একটি আদর্শ ইসলামি পরিবার তখনই গঠিত হয় যখন স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই তাদের অধিকারের চেয়ে নিজেদের কর্তব্যের প্রতি বেশি সজাগ থাকেন। মহান আল্লাহ তাআলা এই সম্পর্কের ভেতরে ভালোবাসা এবং দয়া সৃষ্টি করেছেন যা একটি ঘরকে প্রশান্তির নীড়ে পরিণত করে। বর্তমান সময়ে যখন পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং অশান্তি প্রকট আকার ধারণ করছে তখন কুরআন ও সুন্নাহর দিকনির্দেশনা অনুসরণ করাই হলো একমাত্র সমাধানের পথ।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্ককে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি এই সম্পর্ককে একে অপরের পোশাক হিসেবে অভিহিত করেছেন। মহান আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন: ﴿هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "হুন্না লিবা-সুল্লাকুম ওয়া আনতুম লিবা-সুল্লা হুন্না।" অর্থ: "তারা তোমাদের জন্য পোশাকস্বরূপ এবং তোমরাও তাদের জন্য পোশাকস্বরূপ।" (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৭) পোশাক যেমন মানুষের শরীরের ত্রুটি ঢেকে রাখে এবং তাকে বাহ্যিক প্রতিকূলতা থেকে সুরক্ষা দেয় ঠিক তেমনি স্বামী ও স্ত্রী একে অপরের মান-সম্মান রক্ষা করবেন এবং একে অপরের ভুলত্রুটিগুলো পরম মমতায় সংশোধন করে দেবেন। এটিই হলো ইসলামি দাম্পত্যের মূল চেতনা যেখানে একে অপরকে হেয় করার পরিবর্তে সম্মানের আসনে বসানো হয়।

একজন আদর্শ মুসলিম স্বামীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার স্ত্রীর সাথে নম্র ও সুন্দর আচরণ করা। ইসলামি শরিয়তে পরিবারের কর্তা হিসেবে পুরুষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যার অর্থ এই নয় যে সে তার স্ত্রীর ওপর জুলুম বা কঠোরতা করবে। বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ স্বামী। তিনি তার স্ত্রীদের সাথে খেলাধুলা করতেন তাদের কাজে সাহায্য করতেন এবং তাদের সাথে সবসময় হাসিমুখে কথা বলতেন। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জুতো সেলাই করতেন এবং ঘরের ছোটখাটো কাজেও অংশ নিতেন। তিনি উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন যে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে তার পরিবারের নিকট উত্তম। একজন মুমিন ব্যক্তি যখন ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরেন তখন তার স্ত্রীর হাসি এবং উত্তম ব্যবহার তার সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দেয় আর এটিই হলো একটি সফল দাম্পত্যের নিদর্শন।

পরিবারের শান্তি বজায় রাখতে স্ত্রীর ভূমিকাও অপরিসীম। ইসলাম নারীকে ঘরের রানী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে যার কোল থেকে জন্ম নেয় আগামীর সালাহউদ্দিন আইয়ুবী বা ইমাম বুখারীর মতো মহান ব্যক্তিত্বরা। একজন নেককার স্ত্রী কেবল দুনিয়ার সম্পদ নয় বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষায় এটি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সম্পদ। স্ত্রীর প্রধান কর্তব্য হলো স্বামীর আনুগত্য করা এবং ঘরের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখা। যখন স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই একে অপরের হকের ব্যাপারে সচেতন থাকেন তখন সেই ঘরে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার সম্পদ এবং নিজের সতীত্ব রক্ষা করা একজন আদর্শ মুসলিম নারীর পরিচয়। যখন কোনো স্ত্রী তার স্বামীর সন্তুষ্টি অর্জন করে মৃত্যুবরণ করেন তখন তার জন্য জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত হয়ে যায়।

পারিবারিক জীবনে অনেক সময় মতবিরোধ বা মান-অভিমান হতে পারে যা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তবে ইসলাম এই কলহকে দীর্ঘস্থায়ী করতে নিষেধ করেছে। কোনো অবস্থাতেই একে অপরের প্রতি কঠোর ভাষা ব্যবহার করা বা পরিবারের গোপনীয়তা বাইরে প্রকাশ করা উচিত নয়। সহনশীলতা হলো একটি টেকসই পরিবারের মেরুদণ্ড। স্বামী যদি কখনো রাগান্বিত হন তবে স্ত্রীর উচিত ধৈর্য ধরা এবং স্ত্রী যদি কোনো ভুল করেন তবে স্বামীর উচিত তাকে কোমলভাবে বুঝিয়ে বলা। সহীহ মুসলিমের একটি হাদিসে এসেছে যে কোনো মুমিন পুরুষ যেন তার মুমিন স্ত্রীকে ঘৃণা না করে কারণ তার একটি দিক অপছন্দ হলে অন্যটি অবশ্যই ভালো লাগবে। এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমান যুগের প্রতিটি দম্পতির জন্য অত্যন্ত জরুরি যা সংসারকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।

সন্তানদের সামনে বাবা-মায়ের আচরণ কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে ইসলাম অত্যন্ত সচেতন। সন্তানরা যা শোনে তার চেয়ে বেশি শেখে যা তারা চোখের সামনে দেখে। যখন তারা দেখে তাদের বাবা মায়ের সাথে অত্যন্ত সম্মানের সাথে কথা বলছেন এবং মা বাবার আনুগত্য করছেন তখন সেই সন্তানদের অন্তরে বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ছোটদের প্রতি মমতা জন্ম নেয়। পরিবারের বড়দের বিশেষ করে দাদা-দাদি বা নানা-নানির প্রতি সদ্ব্যবহার করাও পারিবারিক বন্ধনের অংশ। ইসলামে বৃদ্ধ পিতা-মাতার সেবা করাকে জান্নাতের চাবিকাঠি বলা হয়েছে। যখন একটি পরিবারে সব বয়সের সদস্যরা একে অপরের সাথে দ্বীনি বন্ধনে আবদ্ধ থাকে তখন সেই ঘর একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয় যা শয়তানের প্ররোচনা থেকে মুক্ত থাকে।

বর্তমান প্রযুক্তির যুগে আমরা যখন স্ক্রিন বা ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় ব্যয় করছি তখন পারিবারিক সময় কমে যাচ্ছে। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় কাটানো একটি নেক আমল। একসাথে খাবার খাওয়া নিয়মিত জামাতের সাথে নামাজ আদায় করা এবং দ্বীনি আলোচনায় বসা একটি পরিবারের আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধি করে। যখন একটি ঘর থেকে নিয়মিত তিলাওয়াতের আওয়াজ আসে তখন সেই ঘর থেকে অন্ধকার দূর হয়ে যায়। প্রতিটি মুসলিম দম্পতির লক্ষ্য হওয়া উচিত কেবল দুনিয়াতে নয় বরং পরকালেও জান্নাতে একসাথে থাকার আকাঙ্ক্ষা করা। আর সেই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে পারিবারিক প্রতিটি কাজ মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর ভিত্তি করে হতে হবে।

পরিশেষে বলা যায় যে একটি শান্তিময় পরিবার হলো আল্লাহর এক বিশেষ উপহার। পারিবারিক প্রতিটি মুহূর্তকে ইবাদত হিসেবে গণ্য করে ধৈর্য ও ভালোবাসার সাথে জীবন অতিবাহিত করাই হলো ইসলামের শিক্ষা। মহান আল্লাহ আমাদের প্রতিটি মুসলিম পরিবারকে রহমত ও বরকতে পরিপূর্ণ করে দিন এবং আমাদের ঘরগুলোকে সুন্নাহর আলোয় আলোকিত করুন। পারিবারিক কলহ দূর করে আমাদের মধ্যে একে অপরের প্রতি মায়া ও মমতা বৃদ্ধি করে দিন। আমিন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

পরিবার বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!