বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২

ইসলামি পরিবার রক্ষা ও সন্তানদের সঠিক দ্বীনি লালন-পালন পদ্ধতি

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০১:১৯ পিএম
ইসলামি পরিবার রক্ষা ও সন্তানদের সঠিক দ্বীনি লালন-পালন পদ্ধতি

পরবর্তী প্রজন্মের দ্বীনি শিক্ষা | ছবি Ai

ইসলামি সমাজকাঠামোতে একটি পরিবার কেবল একটি সামাজিক একক নয় বরং এটি একটি আধ্যাত্মিক দুর্গ যা প্রতিটি সদস্যকে পার্থিব ও পরকালীন বিপদ থেকে রক্ষা করে। মহান আল্লাহ তাআলা মুমিনদের ওপর কেবল নিজেদের সংশোধন নয় বরং তাদের পরিবার-পরিজনকেও সঠিক পথে রাখার এক বিশাল দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। যখন একটি পরিবার কুরআন ও সুন্নাহর ছায়াতলে পরিচালিত হয় তখন সেখানে মহান রবের পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত ও বরকত নাজিল হয়। বর্তমান ফিতনার যুগে যেখানে অপসংস্কৃতি ও অনৈতিকতা আমাদের ঘরগুলোতে প্রবেশ করছে সেখানে একটি মজবুত ইসলামি পরিবার গঠন করা কেবল সুন্নত নয় বরং প্রতিটি মুসলিম অভিভাবকের জন্য অপরিহার্য দায়িত্ব।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা পরিবারকে বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করার জন্য অত্যন্ত কঠোর ও সুস্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করেছেন। মহান আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন: ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "ইয়া- আইয়্যুহাল্লাযীনা আ-মানূ কূ আনফুসাকুম ওয়া আহলীকুম না-রা-।" অর্থ: "হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর আগুন থেকে।" (সূরা আত-তাহরীম, ৬৬:৬) এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে পরকালীন মুক্তি কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের ওপর নির্ভরশীল নয় বরং নিজের অধীনস্থদের জাহান্নামের পথ থেকে ফিরিয়ে জান্নাতের পথে পরিচালনা করাও ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একজন মুমিন কখনোই একা জান্নাতে যাওয়ার কল্পনা করতে পারেন না বরং তিনি তার প্রিয়জনদের সাথে নিয়েই মহান আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে চান।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিবারের প্রধানকে একজন রাখাল বা দায়িত্বশীল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে তিনি উল্লেখ করেছেন যে তোমাদের প্রত্যেকেই একজন রাখাল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের সদস্যদের জন্য দায়িত্বশীল এবং তাকে তাদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। এই দায়িত্বের পরিধি কেবল অন্ন বস্ত্র ও বাসস্থানের সংস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং তাদের আকিদা বিশ্বাস চরিত্র এবং আমল সংশোধনের দায়িত্বও অভিভাবকের ওপর ন্যস্ত। যখন একজন পিতা তার সন্তানকে নামাজের নির্দেশ দেন বা পর্দা ও শালীনতার শিক্ষা দেন তখন তিনি মূলত একটি সুন্দর ও নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখেন।

পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দ্বীনি জ্ঞান বা তরবিয়ত প্রদানের পদ্ধতিটি হতে হবে অত্যন্ত কোমল ও প্রজ্ঞাপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কারো ওপর দ্বীন চাপিয়ে দেননি বরং তিনি তার আচরণের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছেন। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই আল্লাহর পরিচয় ও আখেরাতের জবাবদিহিতার ভয় অন্তরে গেঁথে দেওয়া উচিত। যখন একটি পরিবারে নিয়মিত হাদিস পাঠ ও সীরাতের আলোচনা হয় তখন সেই ঘরের সদস্যদের মানসিক জগত আল্লাহর প্রেমে সিক্ত হয়। মনে রাখতে হবে যে শিশুরা যা শোনে তার চেয়ে বেশি শেখে যা তারা বড়দের করতে দেখে। তাই অভিভাবককে আগে নিজে একজন আদর্শ মুসলিম হিসেবে গড়ে উঠতে হবে যাতে সন্তানরা তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হতে পারে।

পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখার জন্য একে অপরের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট থাকা জরুরি। বর্তমান সময়ে আমাদের পরিবারগুলো ভেঙে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো আমরা কেবল নিজেদের অধিকার নিয়ে সচেতন কিন্তু অন্যের হক আদায়ে উদাসীন। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে বড়দের সম্মান করা এবং ছোটদের স্নেহ করা। যখন পরিবারের প্রতিটি সদস্য একে অপরের প্রতি সহনশীল হয় তখন সেখানে ছোটখাটো মান-অভিমান দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান জানে না সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। এই নীতিটি যদি একটি পরিবারের মূলমন্ত্র হয় তবে সেই ঘরে কখনো অশান্তি দানা বাঁধতে পারে না।

একটি আদর্শ পরিবার হলো সেই ঘর যেখানে আল্লাহর জিকির ও নামাজের পরিবেশ বিদ্যমান থাকে। যে ঘরে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করা হয় সেই ঘর থেকে শয়তান বিতাড়িত হয় এবং ফেরেশতারা সেখানে অবস্থান করেন। পরিবারের সবাই মিলে জামাতের সাথে অন্তত এক ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা বা একসাথে বসে দ্বীনি কোনো মাসআলা আলোচনা করা পারিবারিক সংহতি বৃদ্ধি করে। আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে আমরা যখন একে অপরের সাথে থেকেও যান্ত্রিক পর্দার কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি তখন ইসলামের এই ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক মূল্যবোধ আমাদের মানসিকভাবে শক্তিশালী রাখতে সাহায্য করে। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করাও পারিবারিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা আমাদের রিযিক ও আয়ু বৃদ্ধির কারণ হিসেবে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায় যে একটি সফল ও সুখী পরিবার কেবল তখনই সম্ভব যখন সেই ঘরের প্রতিটি কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর ভিত্তি করে আবর্তিত হয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত কেবল দুনিয়াতে একটি আরামদায়ক জীবন নয় বরং আখেরাতে যেন আমরা আমাদের পুরো পরিবার নিয়ে জান্নাতুল ফিরদাউসে একত্র হতে পারি। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে নিজেদের পরিবারকে কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক পথে পরিচালনা করার তৌফিক দান করুন এবং আমাদের প্রতিটি ঘরকে জান্নাতের এক একটি টুকরো হিসেবে কবুল করে নিন। আমাদের সন্তানদের নেককার ও দ্বীনের খাদেম হিসেবে কবুল করুন। আমিন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

পরিবার বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!