শুক্রবার, ০৬ মার্চ, ২০২৬, ২১ ফাল্গুন ১৪৩২

আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ কি বিশ্ব অর্থনীতি ধ্বংসের কারণ হবে?

উম্মাহ কণ্ঠ মার্চ ৫, ২০২৬, ১১:১৩ এএম
আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ কি বিশ্ব অর্থনীতি ধ্বংসের কারণ হবে?

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত মরুভূমির বুকে যখন যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে তখন আকাশ বাতাস ভারী হয়ে যায় বারুদ আর ধ্বংসের গন্ধে। বর্তমানে ইরান, আমেরিকা এবং ইসরায়েলের মধ্যকার এক সম্ভাব্য সর্বাত্মক সংঘাতের প্রেক্ষাপট নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইসরায়েল ও আমেরিকার যৌথ সামরিক হামলার তীব্রতায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ওপর আঘাতের মতো কোনো আকস্মিক ঘটনা পুরো অঞ্চলকে এক ভয়াবহ খাদের কিনারায় ঠেলে দিতে পারে। 

এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যেখানে একটি রাষ্ট্র তার চারপাশের অসংখ্য প্রতিকূল শক্তির বিরুদ্ধে একাই লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে বাধ্য হয়। এই সংঘাতের মূল শিকড় মূলত ২০০০ সালের দিকে প্রোথিত যখন পশ্চিমা বিশ্ব ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে সন্দেহের তীর ছুঁড়তে শুরু করে। তাদের অভিযোগ ছিল ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে। অথচ পারমাণবিক প্রযুক্তি কেবল মারণাস্ত্র তৈরির কাজে নয় বরং বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ক্যান্সারের চিকিৎসার মতো অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর এই আশঙ্কার বশবর্তী হয়ে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র মিলে ইরানের ওপর অত্যন্ত কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে হ্রাস পায় এবং দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থা বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক স্থবির অবস্থায় পতিত হয়। এই অচলবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১৫ সালে ইরান ও বিশ্বের ক্ষমতাধর ছয়টি দেশের মধ্যে ‍‍`জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন‍‍` বা জেসিপিওএ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ইসলামে চুক্তি রক্ষার ওপর অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "আর তোমরা যখন অঙ্গীকার কর, তখন আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ কর এবং শপথ দৃঢ় করার পর তা ভঙ্গ করো না" (সূরা আন-নাহল, ১৬:৯১)। এই চুক্তির মূল শর্ত ছিল ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখবে এবং বিনিময়ে তাদের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে।

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের প্রক্রিয়াটি অনেকটা দুধ থেকে মাখন তৈরির মতো জটিল। অল্প সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদ্যুৎ ও চিকিৎসায় ব্যবহৃত হলেও বোমা বানানোর জন্য একে অতিমাত্রায় সমৃদ্ধ করতে হয়। ইরান চুক্তির শর্ত মেনে আন্তর্জাতিক নজরদারির অনুমতি দিলেও ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করে নেন। এই বিশ্বাসভঙ্গের ফলে ইরানও পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে তাদের সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়াতে শুরু করে। বর্তমানে আমেরিকা ও ইসরায়েলের দাবি হলো ইরানকে তার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থন সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার পক্ষপাতী, যা মূলত একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত অধিকারকে পদদলিত করার শামিল।

কিন্তু প্রশ্ন হলো বিশাল সামরিক শক্তির অধিকারী আমেরিকা ও ইসরায়েল কি চাইলেই ইরানকে সহজে পরাজিত করতে পারবে? কেবল আকাশপথে বোমাবর্ষণ করে কোনো দেশের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো প্রায় অসম্ভব। ইতিহাসে দেখা গেছে সরাসরি স্থল অভিযান ছাড়া কোনো দেশ দখল করা যায় না। ইরানে স্থল আক্রমণ যেকোনো পরাশক্তির জন্যই এক দুঃস্বপ্নের মতো। ইরানের প্রতিরক্ষার মূলে রয়েছে তাদের ভৌগোলিক অবস্থান এবং জাতীয়তাবাদী চেতনা। ১৯৫৩ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর মদদে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস ইরানের জনগণের মনে পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে এক গভীর প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ১৯৮০ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আট বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইরান প্রমাণ করেছিল যে ঈমানদাররা যখন একতাবদ্ধ হয়ে লড়াই করে তখন তাদের দমানো কঠিন। মুমিনদের ঐক্যের বিষয়ে আল্লাহর রাসূল ﷺ দৃষ্টান্ত দিয়েছেন যে, মুমিনগণ একে অপরের জন্য একটি সুদৃঢ় ইমারতের ন্যায়, যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তি জোগায় (সহীহ আল-বুখারী, ৬০২৬)।

ভৌগোলিক দিক থেকে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত দুর্গম জাগরোস পর্বতমালা আক্রমণকারীদের জন্য একটি প্রাকৃতিক বাধা। এই পাহাড়ি পথে বড় সামরিক যান নিয়ে অগ্রসর হওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রতিরক্ষাকারীদের জন্য অ্যামবুশ বা অতর্কিত হামলা চালানো সহজ। এছাড়া ইরান নিজেদের প্রতিরক্ষায় ‍‍`এন্টি-এক্সেস এরিয়া ডিনায়াল‍‍` বা এটু-এডি কৌশল গ্রহণ করেছে। এর অর্থ হলো শত্রুকে নিজের সীমানায় ঢুকতে বাধা দেওয়া এবং ঢুকলেও ড্রোন ও মিসাইল হামলার মাধ্যমে তাদের ব্যতিব্যস্ত রাখা। ইরানের হাতে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো দুটি বড় অস্ত্র রয়েছে। প্রথমটি হলো হরমুজ প্রণালী যা দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ তেলের সরবরাহ হয়। যুদ্ধের চরম পর্যায়ে ইরান এই পথ বন্ধ করে দিলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং শিল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। দ্বিতীয়টি হলো লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের প্রভাব যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত করতে সক্ষম।

আমেরিকার সামরিক কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে একটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও আঞ্চলিক সমর্থন এই মুহূর্তে তাদের জন্য পর্যাপ্ত নয়। মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোও নিজেদের স্থিতিশীলতার কথা চিন্তা করে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়। ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে কোনো দেশকে বাইরে থেকে আক্রমণ করা হলে সেদেশের জনগণ অভ্যন্তরীণ বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়। পরিশেষে এটা স্পষ্ট যে পরাশক্তিরা যতই সামরিক ছক কষুক না কেন চূড়ান্ত ফয়সালা সর্বদা মহান আল্লাহর হাতেই থাকে। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, "তারা ষড়যন্ত্র করেছিল, আর আল্লাহও কৌশল করেছিলেন; এবং আল্লাহ কৌশলীদের শ্রেষ্ঠ" (সূরা আল-আনফাল, ৮:৩০)। আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে জালিমদের সকল ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করুন এবং আমাদের মাঝে ঈমানী শক্তি বৃদ্ধি করে দিন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

সংবাদ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!